আকাশটা খুব কালো করে এসেছে।
ফটিক পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে পার্বতীকে একটা একটা করে রুটির টুকরো ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিল।
পার্বতী তাদের সবার আদরের এই পুকুরের সবচেয়ে বড় রুইমাছ । এত্তবড় হাঁ।টুকরোগুলো টুপ
করে জলে ডুব দিতে না দিতেই পার্বতীর মুখের মধ্যেভ্যানিশ। পিছনে দাঁড়িয়ে লেজ
নাড়ছিলো ভূতু। সেও তার রোজকার বরাদ্দ দুটো রুটি পেয়ে আনন্দে হাসিখুসি। আজ আলুর
তরকারী দিয়ে গরম গরম রুটি জমেওছিলবেশ। সে আর দাদু খুব আনন্দ করে খেয়েছে। দাদুর
অবশ্য মায়ের হাতের রান্না এমনিতেই ভারী পছন্দ। বাড়িতে যখন কেউ এসে খাওয়া দাওয়া করে
রান্নার প্রশংসা করেন, দাদু তখন খুব গর্ব করে বলেন "মা আমার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা।"আজকাল
কথায় কথায় দাদুর চোখে জল চলে আসে। জিগ্যেস করলে বলেন " সে তুমি এখন বুঝবে না
দাদুভাই। বড় হয়ে যখন এই দাদুর কথা ভাববে তখন মা দুর্গা তোমায় ঠিক বুঝিয়ে দেবেন।
"
ভূতু এবার অস্থির হয়ে পায়ের
মধ্যে নাক ঘষাঘষি শুরু করেছে। এ সময়টা ওদের দুজনের বাঁশবাগানে বেড়ানোর সময়। ভেজা
ভেজা নাকে ফটিকের বেজায় সুড়সুড়ি লাগছে !
"আচ্ছা বাবা চল। এত ছটফট করলে চলে সবসময়। পার্বতীর খাওয়াটা শেষ করতে দে ! তোর্ মা কি শান্ত, আর তুই হচ্ছিস সারাক্ষণ তিড়িং বিড়িং।"
"আচ্ছা বাবা চল। এত ছটফট করলে চলে সবসময়। পার্বতীর খাওয়াটা শেষ করতে দে ! তোর্ মা কি শান্ত, আর তুই হচ্ছিস সারাক্ষণ তিড়িং বিড়িং।"
ওরা সবে রওনা দেবে, দেখে আনিস পুকুরপাড়
দিয়ে দৌড়ে ফিরছে। ওকে দেখেই চেচিয়ে বলল "কিরে ? তুই মন্ডপে যাসনি কেন? ঠাকুর তো এসে গেছে! "
"ঠাকুর এসে গেছে?? কখন?" ফটিক অবাক।
"সকালেই তো। এবার তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন কুমোরদাদু। বৃষ্টির ভয়ে। "
"ও, হ্যা। মা দুর্গা তো এবার নৌকায় আসছেন। "
শুনতে পেয়ে ফটিকের মা বেড়িয়ে এলেন "মা এসে গেছেন রে আনিস? কেমন হয়েছে এবার ?"
"সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে। কমলকাকু তো খুব খুশি। "
"মা, আমি ঠাকুর দেখে আসছি!" বলেইফটিক চন্ডী মন্ডপের দিকে ছুটল, আর তার পিছন পিছন দৌড় দিল ভুলু।
"সাবধানে যাস বাবা। বৃষ্টি আসছে খুব জোর।"
ছেলেটিকে নিয়ে তার বড় ভয়। দু'বছর আগের বন্যায় ফটিকের বাবা চলে গেলেন। আশেপাশের সমস্ত গ্রাম ভেসে গিয়েছিল। সেবারের পুজো সবারকেটেছিল স্কুল বাড়িতে। এখন ফটিকই তার শিবরাত্রির সলতে। বাবা অবশ্য বলেন "আমাদের ফটিকের কোনো ক্ষতি কখনো হবে না মা। ওর ওপর মা দুর্গার আশীর্বাদ আছে। দেখনি সেবার সারা গ্রাম জলের তলায়, কিন্তু আমাদের ফটিকের কিচ্ছুটি হয়নি। তুমি চিন্তা কোরোনা মা। "
ফটিকের মা শ্বশুর মশায়ের কথায় খুব বিশ্বাস করেন, তবুও এ ব্যাপারে তার চিন্তা হয়।
তিনি "দুগ্গা দুগ্গা" বলে দুহাত ছোঁয়ালেন কপালে।
"ঠাকুর এসে গেছে?? কখন?" ফটিক অবাক।
"সকালেই তো। এবার তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন কুমোরদাদু। বৃষ্টির ভয়ে। "
"ও, হ্যা। মা দুর্গা তো এবার নৌকায় আসছেন। "
শুনতে পেয়ে ফটিকের মা বেড়িয়ে এলেন "মা এসে গেছেন রে আনিস? কেমন হয়েছে এবার ?"
"সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে। কমলকাকু তো খুব খুশি। "
"মা, আমি ঠাকুর দেখে আসছি!" বলেইফটিক চন্ডী মন্ডপের দিকে ছুটল, আর তার পিছন পিছন দৌড় দিল ভুলু।
"সাবধানে যাস বাবা। বৃষ্টি আসছে খুব জোর।"
ছেলেটিকে নিয়ে তার বড় ভয়। দু'বছর আগের বন্যায় ফটিকের বাবা চলে গেলেন। আশেপাশের সমস্ত গ্রাম ভেসে গিয়েছিল। সেবারের পুজো সবারকেটেছিল স্কুল বাড়িতে। এখন ফটিকই তার শিবরাত্রির সলতে। বাবা অবশ্য বলেন "আমাদের ফটিকের কোনো ক্ষতি কখনো হবে না মা। ওর ওপর মা দুর্গার আশীর্বাদ আছে। দেখনি সেবার সারা গ্রাম জলের তলায়, কিন্তু আমাদের ফটিকের কিচ্ছুটি হয়নি। তুমি চিন্তা কোরোনা মা। "
ফটিকের মা শ্বশুর মশায়ের কথায় খুব বিশ্বাস করেন, তবুও এ ব্যাপারে তার চিন্তা হয়।
তিনি "দুগ্গা দুগ্গা" বলে দুহাত ছোঁয়ালেন কপালে।
আনন্দে আর উত্তেজনায় বুক
দুরুদুরু করছিল ফটিকের । আগেরবার সে অনেক ছোটো ছিল। ভালো করে বুঝতে পারেনি।এবার
যদি আবার ওরম হয়!! একদৌড়ে মাঠ, রাস্তা পেড়িয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে যেই কোনমতে মন্ডপে ঢুকলো
ফটিক, আর অমনি
মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো চারিদিকে।চন্ডী মন্ডপে তখন কেউ কোথাও নেই। বৃষ্টির জন্যে
সব শুনশান।
অবাক বিস্ময়ে ফটিক একদৃষ্টে
তাকিয়ে ছিল মা দুর্গার মূর্তিটার দিকে। কি অপূর্ব হয়েছে এবার ! প্রতিবারেই ভালো
করেন কুমোর দাদু , কিন্তু এবার
যেনএকেবারে জীবন্ত !
"তুই তো এক বছরে অনেকটা বড় হয়ে গেছিস দেখছি। "
ওই তো !! সে তবে ভুল করেনি?
ফটিক একটা লাজুক হাসি দিল।
"পুজোয় নতুন জামা হয়েছে তোর্?"
"হ্যা। একটা। "
আরেকটু থেমে সে বলল " ওটা পরে অঞ্জলি দিতে আসব। তখন দেখাবো। দাদু দিয়েছেন । "
"আর .... আমার জন্য কিছু আনিসনি? শুধু নিজেই নতুন জামা পরবি?"
ফটিক খুব সাবধানে সযত্নে তার পকেট থেকে একখানা ম্যাজিকের কাগজ বের করে সামনে রাখলো।
"এটা খুব ভালো। মজার। আমি মেলা থেকে জমানো পয়সা দিয়ে কিনে আমার খেলনার বাক্সের মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম। কেউ জানেনা।"
"বাহ! ম্যাজিক তো আমার খুব পছন্দের। আমার নামই তো মহামায়া। খুব সুন্দর হয়েছে রে ফটিক। এটা এবার যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।
শোন, তুই এখন আয়। বৃষ্টি কমছে। এবার লোকজন চলে আসবে। "
ফটিক খানিকক্ষণ ইতস্তত তাকিয়ে থাকলো, তারপর বলে উঠলো
"একটা কথা জিগ্যেস করব? রাগ করবে না তো ?"
"বল। কিছু মনে করব না। "
"আমার বাবা ভালো আছেন?"
ওই তো !! সে তবে ভুল করেনি?
ফটিক একটা লাজুক হাসি দিল।
"পুজোয় নতুন জামা হয়েছে তোর্?"
"হ্যা। একটা। "
আরেকটু থেমে সে বলল " ওটা পরে অঞ্জলি দিতে আসব। তখন দেখাবো। দাদু দিয়েছেন । "
"আর .... আমার জন্য কিছু আনিসনি? শুধু নিজেই নতুন জামা পরবি?"
ফটিক খুব সাবধানে সযত্নে তার পকেট থেকে একখানা ম্যাজিকের কাগজ বের করে সামনে রাখলো।
"এটা খুব ভালো। মজার। আমি মেলা থেকে জমানো পয়সা দিয়ে কিনে আমার খেলনার বাক্সের মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম। কেউ জানেনা।"
"বাহ! ম্যাজিক তো আমার খুব পছন্দের। আমার নামই তো মহামায়া। খুব সুন্দর হয়েছে রে ফটিক। এটা এবার যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।
শোন, তুই এখন আয়। বৃষ্টি কমছে। এবার লোকজন চলে আসবে। "
ফটিক খানিকক্ষণ ইতস্তত তাকিয়ে থাকলো, তারপর বলে উঠলো
"একটা কথা জিগ্যেস করব? রাগ করবে না তো ?"
"বল। কিছু মনে করব না। "
"আমার বাবা ভালো আছেন?"
এক মুহুর্তের নীরবতা ...
ত্রিভুবনজননীও বুঝি আশা করেন নি এই প্রশ্ন। তারপর বললেন
"হ্যা রে। ভালো আছেন তোর্ বাবা। তুই ভাবিস না। খুব আনন্দে, শান্তিতে আছেন।"
"আচ্ছা। আমি তবে আসছি। আবার বিকেলে আসবো।"
ফটিকের মুখ কৃতজ্ঞতায়, খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠলো।
"হ্যা রে। ভালো আছেন তোর্ বাবা। তুই ভাবিস না। খুব আনন্দে, শান্তিতে আছেন।"
"আচ্ছা। আমি তবে আসছি। আবার বিকেলে আসবো।"
ফটিকের মুখ কৃতজ্ঞতায়, খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠলো।
মাঠ পেরিয়ে লাফাতে লাফাতে বাড়ি
ফিরছিল ফটিক আর ভূতু। আর ভাবছিল "তাহলে আমার ভুল হয়নি? মা দুর্গা সত্যি সত্যি আছেন !! তিনি সত্যি
পুজোর সময় আমাদের এই গ্রামের চন্ডীমন্ডপে আসেন!! এই গ্রামেও? সব গ্রামেই? তার মানে এগুলো সব সত্যি ? "
আর
আমরা বড়রা তো সব জানিই যে এগুলো সব সত্যি।
************************
লেখক উবাচঃ মামার বাড়ির
দুর্গাপুজোয় ছোটবেলা থেকে ভোরে বা গভীর রাতে যখন একদমএকা মাতৃমূর্তির সামনে
দাড়িয়েছি, একটা অদ্ভূত
অনুভূতি হয়েছে। প্রায় সেই একই অনুভূতি হয়েছে ভোরবেলার নির্জন পুরীর সৈকতে একা
সমগ্র সমুদ্রের মুখোমুখি দাড়িয়ে।ভয়, মানবজীবনের তুচ্ছতা, পরিপূর্ণ সমর্পণ .. সব মিলিয়ে কোনো এক আদিম গোপন অনুভূতির
দ্বার খুলে গেছে বলে বোধ হয়েছে , যদিও নিশ্চিত হতে পারিনি।
ভেবেছি ,স্রষ্টা কি কখনো দেখা দেন ?
হয়ত সচরাচর না। কিন্তু কোনো কোনো অপার্থিব মুহুর্তে ইন্দ্রিয় সজাগ রাখলে তাঁর পদসন্চারণ অনুভব করা যায়। মনে হয় এই আমিটুকুই শুধু আমি নই। আমার আরো অনেকখানি রয়ে গেছে এই আমির বাইরে।
ভেবেছি ,স্রষ্টা কি কখনো দেখা দেন ?
হয়ত সচরাচর না। কিন্তু কোনো কোনো অপার্থিব মুহুর্তে ইন্দ্রিয় সজাগ রাখলে তাঁর পদসন্চারণ অনুভব করা যায়। মনে হয় এই আমিটুকুই শুধু আমি নই। আমার আরো অনেকখানি রয়ে গেছে এই আমির বাইরে।
![]() |
ছবি ও লেখা-শিবতোষ সিনহা
|
[লেখক পরিচিতি- পেশাগতভাবে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করে তারপর সফটওয়্যার ইঞ্জিনীয়ার; আর নেশাগত ভাবে সাহিত্যরসিক এবং লেখক। সঙ্গীত ও নাট্যপ্রেমী। লেখার শুরু সেই ছোটবেলায় বাড়ির খাতার পিছনের পাতা থেকে। সেই থেকে আজ অবধি ভাবনা আর স্বপ্নের আঁকিবুকি আলপনা চলছে।]

0 comments: