জম্মুর বদ্ধ হোটেলে নজরবন্দী
কয়েদীর মতো তিনটে চূড়ান্ত অস্বস্তিকর দিন কাটিয়ে মনের যখন ‘ছেড়ে দে মা,কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা, কাশ্মীর দর্শনের যাবতীয় উৎসাহ যখন মাঠেই মৃত্যুবরণের
প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই এক
সন্ধ্যায় উপস্থিত হল ট্রাভেল গাইড রাজু “কাল সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে
যাচ্ছি শ্রীনগরে।” হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
প্রায় আটটা নাগাদ বৈষ্ণোদেবীর শহর
ছেড়ে ডানা মেলে দিলাম স্বপ্নের শহর লেকসিটি শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে, অসহ্য গরম ছেড়ে ঠাণ্ডার রাজ্যে। গাড়ির ড্রাইভারের পাশে
সামনের সিটে আমি। এগারো ঘণ্টার দীর্ঘ পথ, বাকি সহযাত্রীদের মতো যাত্রাপথে ঝিমানোর আহ্লাদ নেই, এখানে এসেছি প্রকৃতির রাজ্যপাটে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য
আর যথেচ্ছ ছবি তোলার জন্য। কিন্তু প্রকৃতি দেবী বোধহয় এত সহজে আমার প্রতি তুষ্ট
হলেন না। সূর্যদেবের ভয়ংকর ভ্রূকুটিতে মাথায় টুপি, চোখে সানগ্লাস লাগাতে হল। আর গাড়ির সামনে বসার যে কি আহ্লাদ, তা রুক্ষ রাস্তার ধূলো আর সূর্যদেবের করুণার আতিশয্যে অতি
শীঘ্রই বোধগম্য হল। পাটনিটপে ঠাণ্ডা পাবো বলে আশ্বাস দিয়েছিল রাজু, সেখানে এক চিলতে ঠাণ্ডার স্পর্শও পেলাম না। বারবার ঘড়ি
দেখছি,
সময় যেন কাটতেই চায় না। স্থানে স্থানে চেকপোস্ট, মিলিটারি জওয়ানরা সর্বদাই তৎপর। একসময় প্রখর সূর্যালোক ছেড়ে
গাড়ি প্রবেশ করল এশিয়ার দীর্ঘতম জওহর টানেলের অন্ধকার সুড়ঙ্গে। প্রায় কুড়ি মিনিট
পর আবার আলোর দর্শন, চোখ মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগলো। এই দীর্ঘ পথ ও
প্রকৃতি ছবি তোলা আর উপভোগ করা দুইয়ের জন্যই অত্যন্ত নীরস। শুধুমাত্র দূরে বরফ
ঢাকা পাহাড় আর গিরিখাত দিয়ে বয়ে চলা নদীর স্রোত মন মাতিয়ে রাখে। শরীরের সমস্ত
শক্তি নিংড়ে নিয়ে প্রকৃতি ক্ষান্ত হল, প্রায় সাড়ে ছটা নাগাদ পৌঁছলাম শ্রীনগরে। রাস্তার বাঁদিকেই দীর্ঘ ডাল লেকের
বুকে ইতস্তত বিচরণকারী শিকারার দল স্বাগত জানালো।
এখানে সন্ধ্যা নামে দেরীতে, সূর্যের তেজ তখন ম্রিয়মাণ হলেও গোধূলি শুরু হয়নি। রাস্তায়
বিপুল সংখ্যক লোকজন-যানবাহনের আনাগোনা, শহর খুবই প্রাণচঞ্চল, ডাল লেকের ধার
বরাবর সিমেন্ট বাঁধানো বেদিতে বসে লোকজন শেষ বেলার আমেজ নিচ্ছে। রংবেরঙের শিকারা
গুলো ভেসে চলেছে। লেকের বিস্তার এখন অনেক কমে গেছে। জলও আর আগের মতো পরিষ্কার নেই।
কাঠের সূক্ষ্ম কারুকার্যময় রংবেরঙের হাউস বোটগুলো একে একে আলোকসজ্জায় সেজে উঠল, কাজল-কালো লেকের জলে তার প্রতিবিম্ব যেন আলাদাই রোশনাই।
ঠাণ্ডার রেশ অনুভব করলাম। লোক জনমুখর সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত এল –তখন চারপাশ
নিস্তব্ধ,
মাঝে মাঝে শুধু ট্রাক আর বাসের আওয়াজ নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে
যায়। এভাবেই শ্রীনগরে প্রথম রাত্রি কেটে গেল।পরদিন শোনমার্গের পথে পাড়ি দেবো।
শ্রীনগর থেকে ৮৭কিমি দূরে বরফ
মোড়া শোনমার্গ। নীলচে সবুজ লাস্যময়ী স্রোতস্বিনীর ছুটে চলার শব্দ শুনতে গাড়ি
থামানো হল বরফের উপত্যকার মাঝে রাস্তার পাশে। গাড়ি থেকে নামতেই খেয়াল হল স্নিকার্স
পরে আসিনি। মোজা ছাড়া সাধারণ জুতো পরে বরফে উঠবো-চলবো কি করে –এই চিন্তা
প্রথমে গ্রাস করলেও নদীর উচ্ছল প্রাণবন্ত রূপ দেখে চিন্তা ভুলে নদীর পাশেই দাঁড়িয়ে
থাকলাম। স্রোতের পথে জেগে ওঠা পাথরকে আদর করে নদী আপন মনে বহমান। ছোটো ছোটো পাহাড়ি
পাখি পাথরের উপর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ প্রকৃতির নেশায় বুঁদ হয়ে আবার
গাড়িতে উঠে বসলাম। জানলা দিয়ে মাথা বের করে ঠাণ্ডার রাজ্যের সুবাস নিলাম প্রাণভরে –খোলা হাওয়া চুল
এলোমেলো করে দিয়ে যায়, কানে ফিসফিস করে
কি যেন বলে যায়।
দুই ধারে শুধুই তুষার শুভ্র পাহাড়
–সবুজ বা ধূসর
উপত্যকা যেন লুকিয়ে পড়েছে। শুধু সবুজ ঝাউগাছগুলো মাথায় বরফের মুকুট পরে সবুজের
চিহ্নটুকু ধরে রেখেছে। সামনে “ওয়েলকাম টু শোনমার্গ” লেখা ব্রিজ
পেরিয়ে শোনমার্গের রাজত্বে প্রবেশ করলাম। কিছু পরেই সূর্যের আলোচ্ছটায় উজ্জ্বল
বরফের রূপ দেখে বিমোহিত হতে হল। বরফ জমে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে গেছে, রাস্তার পাশে সারি সারি গাড়ি। দূরে সাদা বরফের ঢালে ক্ষুদ্র
ক্ষুদ্র কালো মূর্তির সারি বাঁধা দল দেখতে পেলাম। বরফের পাহাড়ে চড়তে কেমন লাগে? অনেকটা দূর গিয়ে অবশেষে ফাঁকা জায়গা পেয়ে গাড়ি থামানো হল।
না বেরোতেই অগুনতি নাছোড়বান্দা স্লেজ বাহীর দল ঘিরে ধরল। এসময় ঘোড় সওয়ারির দল থাকে
না,
কারণ সম্পূর্ণ সবুজ উপত্যকা বরফের নিচে। দস্তানা পরে নিলাম, পায়ের দিকে তাকিয়ে শঙ্কা জাগলেও বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি থেকে।
পিছন পিছন স্লেজ বাহীর দল বকবক করেই চলেছে, পাত্তা না দেওয়াই সমীচীন মনে হল। রাস্তা পেরিয়ে বরফের উপত্যকায় পা রাখতেই
বুঝলাম কি ভুলটাই না করেছি ঐ সাধারণ জুতো পরে এসে। খুব বড়জোর ১০ফুট এগোতে পারলাম
বরফের মধ্যে পা ডুবিয়ে, পায়ে ফ্রষ্ট
বাইট হয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় আর এগোনোর মতো শক্তি হল না। সামনের উঁচু বরফের পাহাড় আর
স্লেজ বাহীদের সাথে অগুনতি ভ্রমণার্থীদের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে দেখে নিজের
বোকামোর উপর রাগ হতে লাগলো। অগত্যা পা ছড়িয়ে রাস্তার ধারে বরফের ওপরই বসে পড়লাম আর
ছবি তুলতে লাগলাম। মসৃণ মাখনের মতো সাদা ভেলভেটের আচ্ছাদন দিয়ে রেখেছে কেউ যেন
পাহাড়ে। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে বরফের পাহাড়ে চড়তে না পারায় হতাশ মন নিয়ে রাস্তায়
নামতে গেছি যেই, হঠাৎ পা পিছলে বরফের ওপর গড়িয়ে
রাস্তায় গিয়ে পড়লাম। সমস্ত জামায় আর চুলে বরফ কুচি আটকে সে এক বিচিত্র পরিস্থিতি।
পাশেই হোটেলে খাওয়াদাওয়া করে এবার ফিরে চললাম শ্রীনগরে। বিকেলের কনকনে ঠাণ্ডা
হাওয়া গাড়ির জানলা দিয়ে মুখে ঝাপটা মারতে লাগলো, তবুও জানলা বন্ধ না করে নির্বিকার চিত্তে আনমনা হয়ে প্রকৃতি দেখতে লাগলাম।
ফিরে এসে বিকেলে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়লাম শ্রীনগর মার্কেটে। নানা গলি ঘুরে বাজার
দেখে ফিরলাম বুলেভার্ড রোড বরাবর ডাল লেকের ধার বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে।
পরদিন সকালে গুলমার্গ দর্শন, শ্রীনগরে শেষ দিন। সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিলাম। ব্যালকনিতে
দাঁড়িয়ে সূর্যের আলো মেখে দূরের পীরপঞ্জাল পর্বত বরফ স্নান করছে যেন। বেশ নীচ দিয়ে
উড়ে বেড়াচ্ছে বার্ন সোয়্যালো, হিমালয়ান গ্রিফন, গোল্ডেন ঈগল, পাইড কিংফিশার আরও কত কি। মনে করে এদিন মোজা আর স্নিকার্স পরে নিলাম, গরম জামা বলতে শুধু পাতলা সোয়েটশার্ট আর দস্তানা। আমার
ঠাণ্ডা কমই লাগে! হলুদ সোনার মতো সরষে ফুলের ক্ষেত পেরিয়ে চললাম গুলমার্গের পথে।
১৫০০শতকে সুলতান ইউসুফ এই শহর আবিষ্কার করেন। এদিনের রাস্তায় বরফের স্তর আগের
দিনের তুলনায় কম, তবে সবুজ-ধূসর
জমির চিহ্ন বরফের চাদরের তলেই লুকিয়ে। রাস্তায় গাড়ির সারি, নাছোড়বান্দা স্লেজ বাহীর দল এসবের সাথে আগের দিনই পরিচয়
ঘটেছে। তবে শোনমার্গের মতো পর্বতঘেরা নয় এই অঞ্চল, বিস্তীর্ণ বরফ ঢাকা উপত্যকা পেরিয়ে পর্বতশ্রেণী শুরু হয়েছে। সোয়েটশার্টটা হাতে
নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি থেকে। সহযাত্রীগণ আশ্চর্যজনকভাবে না বেরিয়ে গাড়িতে থাকার
সিদ্ধান্ত নিল। বরফগলা জল এত লোকের পায়ের ধুলোয় নোংরা জলে পরিণত হয়েছে। সাবধানে ঐ
জলের থেকে পা বাঁচিয়ে প্রবেশ করলাম বরফ মোড়া উপত্যকায়। স্লেজ নিয়ে সকলে লুটোপুটি
খাচ্ছে,
কেউ কেউ এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ পাশের মন্দিরে ঢুকছে আবার কেউ কেউ অতি উৎফুল্ল হয়ে
বরফের মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দূরে ছোট্ট কটেজ, তার সামনে বয়ে চলা জলধারা, তার ওপর ছোট্ট
সাঁকো –যেন ছবি। পাশেই
মন্দির,
ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভ্রমণার্থীর দল, আর বারবার এসে বিরক্ত করতে থাকা স্লেজ বাহীর দল –সব দূরে রেখে
একটা বরফের টিলার ওপর চড়ে বসে পড়লাম বরফের ওপরই, ছবি তুললাম বেশ কিছু। ওঠার সময় কয়েকবার পা পিছলে আছাড় খেলাম, তাও বেশ লাগলো। সিট্রিন ওয়াগটেলের ডাক আর আকাশে উড়তে থাকা
হিমালয়ান গ্রিফন সঙ্গ দিল। সোয়েটশার্ট দরকার হল না, জামা-জিনস ভিজছে ভিজুক, নিরালায় বরফের
কোলে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। এবার ফিরে যাওয়ার পালা, বরফকে বিদায় জানিয়ে গাড়ির উদ্দেশ্যে চললাম। গাড়িতে এসে জানতে পারলাম রোপওয়েতে
চড়া হবে না, কারণ সহযাত্রীগণ উৎসাহী নন। রাগ
হয়ে গেল এমন সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায়।
এদিন বিকেলে রাজু নিয়ে গেল শিকারা
ভ্রমণ করাবে বলে। কালো জলে রংবেরঙের শিকারার দল, তারই মধ্যে একটা শিকারায় উঠে বসলাম। দুলুনিতে প্রথমে টালমাটাল লাগলেও পরে বেশ
মজা নিতে লাগলাম। ১০-১৫ মিনিটের মাথায় আরেকটা শিকারা এসে ধার ঘেঁষে চলতে লাগলো আর
বারবার ‘কাশ্মীর কি কলি’ সেজে ছবি তোলার জন্য বলতে লাগলো। কোথায় একটু শান্ত মনে লেকের মাঝে প্রকৃতির
রূপ সুধা পান করব, তার মধ্যে এই!
কিছুদূর যেতে আরও অনেক শিকারা চোখে পড়লো – ফুল , শাল, সোয়েটার, খাদ্যদ্রব্য কি নেই সেগুলোতে, যেন একটা আস্ত বাজার বিচরণ করে বেড়াচ্ছে। কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে রয়েছে, বৃষ্টি নামলো অচিরেই। পরিষ্কার দিনে শিকারায় চেপে ডাল লেক
তো অনেকেই দেখে, কিন্তু বৃষ্টির ডাল লেকের যে কি
সৌন্দর্য তা উপভোগ করলাম এদিন। বৃষ্টির জল গায়ে মেখে ঠাণ্ডার শিহরণটুকু সঙ্গে নিয়ে
বিমুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম বৃষ্টির সৌন্দর্যকে। অনেকটা দূর পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনল
শিকারা চালক, লেকের এতটা দূরে শিকারার ভিড়
একেবারেই নেই বললেই চলে। সামনেই কারুকার্যময় হাউস বোটের সারি, কতরকম নাম তাদের। প্রচুর সিনেমার শুটিং হয় এইসব হাউস
বোটগুলোতে। লেকের মাঝেই ছোটো গ্রাম, সবজির ক্ষেত, একটা ভাসমান
বাজার যেখানে কাশ্মীরি পোশাক, শাল, সোয়েটার, কুটীর শিল্পের
দোকান থেকে শুরু করে বিউটি পার্লার, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান, রেস্তোরাঁ সবই আছে। শিকারায় করেই গ্রামের অধিবাসীগণ যাওয়া-আসা করেন, শিকারাতেই এদের জীবন কাটে।
তখন সন্ধ্যা নেমেছে, কারুকার্যময় বড় বড় হাউস বোটগুলো আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে।
শিকারা এবার পাড়ের দিকে ফিরে চলল। কাল এসব ছেড়ে রওনা দেব ছোট্ট গ্রাম পহেলগাঁও-এর
উদ্দেশ্যে। আমির খসরুর সেই বিখ্যাত লাইন “ভূস্বর্গ যদি কোথাও থাকে, তবে এই সেই স্থান, স্বর্গ এখানেই, একমাত্র এখানেই” – শ্রীনগরের
স্মৃতির ক্যানভাসটুকু, বৃষ্টির
গন্ধটুকু বুকে নিয়ে হোটেলে ফিরে চললাম।
***********************
![]() |
| ছবি ও লেখা-শ্রেয়া সিকদার |
[লেখিকা পরিচিতি-লেখিকা ইংলিশে
স্নাতক। ভালবাসেন ঘুরতে আর চুটিয়ে ছবি তুলতে। পাখি, প্রকৃতি ও মানুষ জনের ছবি নিজের
ক্যামেরা বন্দি করতেই বেশি পছন্দ করেন। আর ভালবাসেন সেই ঘোরাঘুরির কথা, চেনা-অচেনা
জায়গার কথাকে গুছিয়ে লিখে রাখতে। ]




.jpg)
.jpg)

0 comments: