শিরোনাম

লন্ডন ও রক সঙ্গীতের সফর

শুনেছিলাম ব্যাচেলর দের ইউ.কে. ট্যুরিস্ট ভিসা দেয়নাপ্রথমবার যখন অ্যাপলাই করেছিলাম, আমার তখন লম্বা চুলভিসা রিজেক্ট। দ্বিতীয় বার,ছোটো চুল১১ সপ্তাহের ক্র্যাশ কোর্স ইন মিডি টেকনোলজি অ্যাডমিসন ইন কিংসলে কলেজ বাংলাতে ইন্টারভিউ আমি ইংলিশটা বলতেই পারিনা,এরকম বোঝালাম ইন্টারপ্রেটারের সাহায্যে। ফেরত আসার কারণ জানালাম, আমার প্রপার্টি এবং বুড়ো বাবা- মাভিসা পেলাম মাত্র ৬ মাসের জন্য। তাও আবার  টুরিস্ট ভিসা
১৯৯৯ এর সেপ্টেম্বর মাসে,এয়েরোফ্লোট ফ্লাইট এ করে,মস্কো হয়ে  লন্ডনহিথ্রো এয়ারপোর্ট প্লেন থেকে নেমেই খেলাম একটা সজোরে থাপ্পর না কোনো মানুষের নয়, লন্ডন এর ঠান্ডা হাওয়ার থাপ্পরআমার জেঠুর বাড়ি লন্ডন এ দিদির মার্সিডিজ এ চড়ে লন্ডন শহরটা দেখতে দেখতে পৌছলাম জেঠুর বাড়িতেদিদির বাড়ি কেনা-বেচার বিজনেসদ্বিতীয় দিন থেকেই আমার কাজ শুরু হয়েগেল দিদির বাড়িগুলোর মেইনটেনেন্স, ইন্ডোর ডেকরেশন( রং করা) থেকে সুরু করে,প্লাম্বিং,রুফিং,সবই করতে হতো আমাকেআমি ছিলাম লেবার আর আমার বস ছিল একজন আইরিশ ছেলে,নাম মাইকেলআমি তাঁকে ডাকতাম মিক বলে। মিক হয়েগেল লন্ডনে আমার প্রথম বন্ধু কারণ মিকও আমার মতো ক্লাসিক রক-এর ভক্ত ছিল 

লন্ডনে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল মিউসিক। তাই আমি ওখানকার ফ্রি অ্যাডস গুলো স্টাডি করতে থাকলাম যে ব্যান্ড এর জন্য কারা গিটারিস্ট খুঁজছে। কিন্তু কোনো ভালো রেসপন্স পেলাম নাসবাই চাইছিল যে আমি যেন কোনও না কোনও রক স্টার এর মত দেখতে হইতখন মিক আমাকে বলল, স্যান্ডি,ইউ গিভ ইউর ওন অ্যাডভার্ট দ্যাট ইউ আরে লুকিং ফর এ রক ব্যান্ড (তুমি নিজেই নিজের অ্যাড দাও যে তুমি একটা রক ব্যাণ্ড খুঁজছো)। তাই করলামআমি একটা আমার ডেমো ক্যাসেট নিয়ে গেছিলামঅনেক ফোন আসতে শুরু করলোকিন্তু তাও,কোনটাই আমার পছন্দের মত হচ্ছিল না তারপর হঠাৎ একদিন একটা ফোন এলোকথা বলার পর আমার মনে হলো এটাই ঠিক হবেআমি ওদের আমার ডেমো পোস্ট করলাম আর ওরাও আমাকে ওদের ডেমো পাঠালো। দু দিন পরেই চলে এলো সিডি। গান গুলো শুনে পছন্দ হলোকিছুদিন পর আবার ওরা ফোন করলোযেই ছেলেটা ফোন করত,তার নাম রিচার্ড ডেভেনপোর্ট, ব্যান্ড এর ভোকালিস্ট কাম গিটারিস্টওদের আর একজন গিটারিস্ট ব্যান্ড ছেড়ে দিয়েছেরিচার্ড জানালো একদিন জ্যাম করতে হবেজ্যামিং করতে হবে কিংস্টন বলে একটা জায়গায়,যেটা লন্ডন এর এক্সট্রিম সাউথ-ইস্ট এ আর আমার বাড়ি ছিল এক্সট্রিম নর্থ-ইস্ট এ

লন্ডন এর একটা সুবিদে হচ্ছে,প্রত্যেক অঞ্চলের ম্যাপ পাওয়া যায়। ইংলিশ পড়তে পারলে, হারিয়ে যাবার কোনো চান্স নেইরাস্তার ম্যাপ,আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনের ম্যাপ,সারফেস ট্রেনের ম্যাপ সবই পাওয়া যায়। আন্ডার গ্রাউন্ডটাই তাড়াতাড়ি। এখানে একটু লন্ডন-এর আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক এর কথা বলি ম্যাপ দেখে মনে হয় আন্ডার গ্রাউন্ড আগে বানানো হযেছিল,তারপরে শহরএমন কোনো জায়গা নেই যেটা আন্ডার গ্রাউন্ড কভার করে না আর একটা ফ্লোর নয়। ইম্পর্ট্যান্ট জায়গা গুলোতে ৩ তলা,৪ তলা নেটওয়ার্কযাইহোক, বেরিয়ে পরলাম কিংস্টন এর পথে৩ টে ট্রেন চেঞ্জ করে, তারপর কয়েকটা স্টপ বাস এ চরে তারপর হেঁটে পৌছলাম আমার গন্তব্য স্থলে পুরো জার্নি টা লাগলো ২ ঘন্টার ওপরলন্ডনে ট্রাভেলিং এর আরেকটা সুবিধে জানাই। ওখানে ট্রাভেল কার্ড পাওয়া যায় ৪ পাউন্ড দিয়ে কার্ড কিনে তুমি যেখানে চাও যেতে পারো। যা খুশি চাপতে পর,ট্রেন অথবা বাস ভ্যালিড টিল মিডনাইট। তারপর শুরু হয় নাইট বাস সার্ভিস

যেখানে আমাদের জ্যাম করার কথা,সেটা হলো একটা ছোটখাটো পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরিযার ভেতর অনেক গুলো ঘর আছে,সাউন্ডপ্রুফ। যেখানে বিভিন্ন ব্যান্ডরা প্রাকটিস করে৪ ঘন্টার চার্জ মোটে ১০ পাউন্ড। ঘরের ভিতর মিক্সার,আম্প্লিফাইয়ার আর একটা ড্রাম কিট রাখা থাকেখালি নিজেদের গীটার ক্যারি করতে হতআমি ঠিক টাইমেই পৌছেছিলামঅ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ৭টার সময়। ঠিক ৭টার সময় একটা গাড়ি এলো নামল একটা ৬ ফুটের ব্লন্ড হেয়ার ফেলোজানতে পারলাম এই হচ্ছে রিচার্ড। কিছুক্ষনের মধ্যেই বাকিরাও চলে এল। সবার সাথে আলাপ পর্ব সারা হয়েগেল। আমাদের অ্যালোর্টেড ঘরে ঢুকলাম আর আমাদের সেশন শুরু করেদিলাম। আমি ওদের গানগুলো তুলে নিয়েছিলাম৫ টা গান পর পর বাজালামতারপর একযু ফ্রি স্টাইল জ্যাম করলামওরা সবাই আমার অ্যাটিটিউডে ইম্প্রেস হয়েছিল। ওরা আমাকে কয়েকটা রুল বলে দিল (১) আমাকে ঘুমোতে কম হবে (২) আমাকে ট্রাভেল করতে হবে এন্ড (৩) একটু টাকা খরচা করতে হবেআমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আমি ইন্ডিয়ান বলে কি কোনো চাপ আছেওরা বলেছিল যে উই ডোন্ট কেয়ারদ্যাটস ইট। শুরু হয়েগেল আমাদের উইকলি একদিন করে রিহার্সাল ৪ঘন্টা এক নাগাড়ে নো রিল্যাস্কএখানে যেমন দুটো গান এর পরেই আমরা একটা সিগারেট আর চা এর ব্রেক নিয়ে থাকি,ওখানে ওসবের কোনো সিন নেইফ্ল্যাট আউট প্রাকটিস২ সপ্তাহের মধ্যে আমরা আমাদের ১২ টা গান রেডি করে ফেললাম। যার টোটাল টাইম দেড় ঘন্টা। তারপর থেকেই শুরু হয়েগেল আমাদের ট্যুর প্রতি উইকএন্ড-এ আমাদের শো থাকত 

এই ব্যপারটা একটু বলি লন্ডনের মিউসিক সিন কলকাতাতে যেমন পাড়ায় পাড়ায় চা-এর দোকান আছে,লন্ডনে তেমন পাড়ায় পাড়ায় বিয়ার পাব আছে যেখানে লাইভ ব্যান্ড হয় শুধু তাই নয়। বেশিরভাগ অঞ্চলেই স্পেশালাইজড পাব আছে। একটা রক পাব, তার পাশেই মেটাল পাব, ব্লুজ পাব, জ্যাজ পাব যেকোনো ব্যান্ড পারফর্ম করতে পারেএইসব পাব গুলিতে যা যা সুবিধে আছেপ্রথমতঃ ফ্রি তে পারফর্ম করা যায়দ্বিতীয়তঃ টিকিট সেলের ২০ পার্সেন্ট ব্যান্ড গ্রুপ কে দিয়ে দেওয়া হয়। ৪ বছর পারফর্ম করার পর আমরা তো ৪০ পার্সেন্টও পেতাম। আর আমরা মোটামুটি সব ভালো ভালো পাব গুলিতেই পারফর্ম করেছি। তবে সব থেকে মেমোরেবল হচ্ছে ব্র্যাডফোর্ডের রিও পাব-এ পারফর্ম করা। সেখানে আমরা ৩বার পারফর্ম করেছি। প্রথমবার যখন পারফর্ম করতে গেছিলাম তখন আমাদের ইকুইপমেন্ট আমাদের নিজদেরকেই বহন করতে হয়েছিল। আমাদের পারফর্মেন্স সবার খুব পছন্দ হয়েছিল। তাই দ্বিতীয়বার যখন গেছিলাম তখন পাব-এর লোকজন আমাদের ইকুইপমেন্টস বহন করেদিয়েছিল। আর তৃতীয়বার তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার হয়েছিল। আমাদের পারফর্মেন্স দেখতে পুরো পাব প্যাক্ট ছিল।এমনকি প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাওয়ার পরও বহু লোক বাইরে অপেক্ষা করছিল আমাদের পারফর্মেন্স দেখার জন্য।

আমাদের ব্যান্ড এর নাম ছিল থ্রু দ্য স্ট্রর্ম টিটীএস আমরা চার জন আমি- গিটার, রিচার্ড ভোকালস এন্ড গিটার, অ্যান্ডি স্লেড বাস গিটার অ্যান্ড জেমস অ্যান্ড্রু-ড্রাম ওরা তিন জনেই একদম ডাউন টু আর্থ। ১০০ % ডেডিকেটেড টু মিউসিক রিচার্ড এমনিতে কাজ করত লাইব্রেরিয়ান হিসেবে, জেমস হল ব্যাংকার আর  অ্যান্ডি ডেলিভারি ভ্যান চালাতো আমরা অ্যান্ডর ভ্যানেই ট্রাভেল করতাম যখন শো থাকতরিহার্সাল এর সময়ে আমাদের প্রধান এনার্জি গিভার ছিল এক বোতল করে কোক ওরা কেউই সিগারেট খেত না সেই জন্য আমিও খেতামনা প্রাকটিসের সময়ডিসিপ্লিন ছিল আমাদের ফার্স্ট প্রাইয়োরিটি।
কলকাতার ব্যান্ড গুলোর মতো আমরা কখনই প্রসেসর ব্যাবহার করতামনা। আমি একটা ১০০ ওয়াট-এর মার্শাল অ্যামপ্কিনেছিলাম রিচার্ডেরও তাই ছিল আমাদের দুটো সাউন্ড ছিলএকটা ডিস্টোর্শন রীদম আর  একটা ডিস্টোর্শন লিড টোন এবং সত্যি আমাদের প্রচুর ফ্যান ফলোয়িং ছিল। এমনকি যেখানে আয়রন মেডেন তাদের ক্যারিয়ার শুরু করেছিল সেই পাবেও আমরা পারফর্ম করেছি-রাস্কিন আর্মস পাবআমাদের ৪ বছর স্ট্রাগলের পর, আমরা প্রথম ব্রেক পেলাম। ক্রিসাল্লিস রেকর্ডস এর ম্যানেজার, রদ স্মলউড আমাদের সঙ্গে নিজে দেখা করতে এসেছিল এবং আমাদের রেকর্ডিং-এর অফার দিয়েছিল কিন্তু তার আগে আমাদের ফ্রান্স, জার্মানি র হল্যান্ড ট্যুর করতে হবে ব্যাশ আমার মাথায় বাজ। কারণ আমার কাছে ভিসা না থাকার ফলে আমি ইউ.কে ছাড়তে পারবোনা। আমরা অনেক চেস্টা করেছিলাম সলিসিটর দের সাথে কথা বলে। কিন্তু কিছুই হলনা। আমাকে শেষ পর্যন্ত দল ছেড়ে দিতে হল। তখন ঠিক করলাম আবার কলকাতায় ফিরে আসব।
কলকাতা আর ইউ.কে-এর মিউসিক সিন এর পার্থক্য হলো এখানে ব্যান্ডরা কভার করে বিভিন্ন ব্যান্ড দের প্লাস অরিজিনাল মিউসিক আর ইউ.কে তে ট্রিবিউট ব্যান্ড আর ওরিজিনাল ব্যান্ড আলাদা আলাদা। আমরা মোস্টলি অ্যাওয়ার্ড উইনিং থিন লিজ্জি আর এসি/ডিসি ট্রিবিউট ব্যান্ডদের সঙ্গে শো গুলো করা শুরু করেছিলামতারপর একাই।

এই হচ্ছে আমার ইউ.কে-এর মিউসিকাল জার্নি। আরো অনেক রকমের এক্সপেরিয়েন্স আছেসেগুলো নিয়ে আবার ফিরে এসব,যেমন আমার ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স মিউসিকের বাইরেযেটা আরেকটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো
************************************************

ছবি ও লেখাঃ সন্দীপ বোস
[লেখক পরিচিতিঃ  সঙ্গীতবিদ ও সঙ্গীত প্রশিক্ষক,প্রধান শিক্ষক রোলাল্ড মিউজিক স্কুল,প্রাক্তন মুখ্য গীটার বাদক ব্রিটিশ ব্যান্ড থ্রু দ্যা স্ট্রম’,বর্তমান সদস্য আন্ডার কভার’, কর্ণধার কলকাতা স্কুল অব রক্‌’।] 







0 comments: