শিরোনাম

সোনার দেশ জিম্বাবওয়েতে- পর্ব ১

ছবি ও লেখা প্রদীপ কুমার বিশ্বাস
লেখক পরিচিতিঃ প্রদীপ কুমার বিশ্বাস পেশায় খনিজ অনুসন্ধানিক ভুতত্ববিদ, নেশা লেখা-লেখি ও অবসর সময়ে বিভিন্ন বই পড়া। পেশার জন্য পৃথিবীর নানাদেশে কাজ করতে হয়েছে লেখককে। দেখেছেন কাছ থেকে প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ। মানুষ এবং জীব-জন্তু ,অনুভব করেছেন তাদের সুখ, দুঃখ, হাসি -কান্না। বেশির ভাগ লেখা সেই সব অভিজ্ঞতা নিয়েই। 

                                         


                                    ***************************************************


জিম্ব্বাবোতে সেদিন এবং তার পরে পুরো একটা রাত সব ব্যাপারটা ঘটেছিলো স্থানীয় ভূতত্ত্ববিদ জীবনের জন্যে| ও সেইসময় গ্রানাইট  পাথরে হোঁচট না খেলে আমরা শুধু হতাশ হয়ে হয়ত ফিরে চলে আসতাম, গ্রানাইট পাহাড়ের সোনার সন্ধান অধরাই থাকতো । তবে সেদিন মেঘলা আকাশের দরুন ওর জি পি এস ভুল করতে করতে আমাদের রাস্তা ভুলিয়ে দেয়, এবং আমরা রাত কাটাই চিতাবাঘের গুহার কাছে ।

আমরা যে  ভারতীয় কোম্পানির হয়ে জিম্বাবোতে সোনা অনুসন্ধানে এসেছি এই দেশে তারা কয়েক পুরুষ ধরে অন্য জিনিসের ব্যবসা করেছে | জিম্ব্বাবো  সত্যি করে সোনা আর হিরের দেশ | এক টন পাথরে এখানে কুড়ি- তিরিশ গ্রাম সোনা অনায়াসে পাওযা যায়  নদীর বালুতটে আর পাহাড়ের তলায়।  এক সপ্তাহ এসব দেখে আমদের তো তাক লেগে গেল|

এখানে আসার আগে আমরা একটা প্রাথমিক অনুসন্ধান করে নিয়েছিলাম ভারতে বসেই| প্রসঙ্গত বলি সোনা  অনুসন্ধানে, ভূতাত্ত্বিক কতকগুলো প্রাথমিক খোঁজ  করে নেন| সেই সমস্ত দিক গুলো দেখবার পর আমরা দেখি কোথায় আগ্নেয়শিলা আছে | অনেক সময় এই সব শিলাতে, অন্য ছোট ছোট আগ্নেয় পাথরের অজস্র  শিরা  আড়া  আড়ি ভাবে কেটে যায় আর দেখা যেতে পারে কখনো ধুসর কোয়ার্টজ পাথর| এই পাথরে এমন কি তার সঙ্গের পাথরেও  থাকতে পারে মূল্যবান হলুদ ধাতু- সোনা| সঙ্গ দোষ থুড়ি গুন আর কি !
আমরা ভারতে বসে দিনের পর দিন জিম্বাবোয়ের  উপগ্রহ চিত্রে খুঁজে বেড়িয়েছি এইরকম পাথরের পাহাড় কোথায় আছে, আর তাতে ধুসর কোয়ার্টজ  পাথর পাবার সম্ভাবনা কতটা হতে  পারে| এইভাবে আমরা বেশ কিছু জায়গা চিন্হিত করেছিলাম| এর সাথে আর একটি কথা আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছিলো | এরকম প্রায় সব জায়গা তো সাদা চামড়াদের  কবলে, আমদের এমন কোনো সেরকম সম্ভাবনাময় জায়গা খুঁজে বার করতে হবে যেখানে অন্য কেউ এখনো এসে পৌছায় নি | এ জিনিস একমাত্র  জিম্বাবো পৌঁছেই করা যেতে পারে|

জিম্বাবোতে  আমরা তার ভূ-প্রকৃতির সাথে পরিচিত হবার সাথে সাথে সে দেশের সরকারী খনি এবং  ভূতাত্ত্বিক বিভাগ গুলোতে ঘুরে বেশ নিরাশ হচ্ছিলাম | সোনার সম্ভাবনাময় কোন কোন জায়গা গুলো অন্যের দখল মুক্ত, সেই অনুসন্ধান মনে হচ্ছিলো সোনা অনুসন্ধানের চাইতে শক্ত| এই করতে করতে আমরা একজন স্থানীয় ভূতাত্ত্বিকের খোজ পেয়ে গেলাম যাদের পুরুষানুক্রমিক ভাবে সম্পতি কেনা  বেচার ব্যবসাও আছে| যে তথ্য গুলো আমরা খুঁজে  বেড়াচ্ছালাম সেগুলো ওর নখদর্পনে, অনায়েসে তার প্রামান্য দলিলের খোঁজ একের পর এক হাজির করতে লাগলো| দেখতে ওকে অনেকটা হিন্দি সিনেমার জীবনের মতো, ওর খটোমটো নাম পাল্টে আমরা ওর নাম দিলাম জীবন, ও হয়ে গেল  আমাদের দলের নতুন  এবং গুরত্ব পূর্ণ সদস্য| সকাল দেখে দিনটা বোঝা যায় এটা মেনে নিলে আমরা আর যেমন বেরোতাম না,  তেমনি সেদিন ওসব একের পর এক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটতো না|

সে সময়টা বৃষ্টি হবার কোথা নেই, কিন্তু সকাল থেকে আকাশে মেঘের আনাগোনা হতে হতে একসময় তারা বেশ আসর জমিয়ে নিল| অকালের বৃষ্টি, একটু পরে থেমে যাবে এই ভেবে আমরা এগিয়ে চললাম| আমাদের যেতে হবে রাজধানি শহর হারারে থেকে দক্ষিনে দুশো  কিলোমিটার দূরে  গ্রানাইট হিল পাহাড়ে | গ্রানাইট একধরনের আগ্নেয় শিলা, নুন ও গোলমরিচ মেশালে যে রকম দেখতে হয়, অনেকটা সেই রকম এই পাথরের রং, অবশ্য এছাড়া আরো রং আছে, যেমন পিঙ্ক গ্রানাইট | উপগ্রহ চিত্রে এই পাহাড়টি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিলো গ্রানাইট  পাথরের এই পাহাড়টিতে  বেশ অনেকটা  জায়গা জুড়ে ধুসর কোয়ার্টজ  পাথরের অনেক গুলি পাতলা শিরা হয়তো আছে| সোনা অনুসন্ধানে এটা আমাদের কাছে খুবই পছন্দের জায়গা তার উপরে,  জীবনের খবর, যে এই পাহাড়ে এর আগে কেউ কোনো খোজ চালায় নি|

আমাদের যাবার রাস্তায় মাঝে পড়বে কদোমা টাউন| কদোমা থেকে একজন স্থানীয় লোককে আমরা তুলে নেবো, এই অভিযানে ওকে হেড মিস্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করা হলেও ও আসলে হবে আমাদের গাইড| জীবনের কথা মতো আমরা এই অভিযানের উদ্দেশ্য যতটা সম্ভব গোপন রাখা যায় তা রাখছি|  সাধারণতঃ এধরনের  অভিযানে যন্ত্রপাতি যায় ছোট ট্রাকে, আমরা যাই  বোলেরোর মতো জীপে| কিন্তু জীবন বললো একসাথে দু-দুটো গ|ড়ি, এটা কিন্তু অনর্থক দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, রাবল নিয়ে যাচ্ছি ভেবে বিপদ হতে পারে| এখানের ভাষায়,  রাবল মানে , সোনা আছে, এরকম বড় বড় পাথরের টুকরো।   এরকম পাথর, নদী ও যে পাহাড়ে সোনা আছে তার তলায় দেখা যায়| সবাই দেখতে পায় না কিন্তু কেউ পেলে তখন সবাই তার ওপর এবং জায়গাটার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে|  ছোটো ট্রাকে গেলে লোকে আমাদের হিচ-হাইকার বলে মনে করবে, তাহলে আর কোনও ঝামেলা হবে না। ছোটো ট্রাক মানে বোলেরো কাম্পেরা গাড়ীর চাইতে সামান্য বড়ো । এ ধরনের গাড়ীতে একটা ছোটো টাব থাকে পেছনে। এই টাবে আছে সপ্তাহ খানেকের রেশন, শুকনো খাবার, ছোটো জেনেরেটার, সার্ভের যন্ত্রপাতি, আর আমাদের কয়েকটা সুটকেস। সব মিলে ওজন কম নয়, এই মাল ভরতি  টাবের জন্যে পরে মুস্কিল কম হলো না।

কডোমাতে সেই লোকটি যাকে আমরা আসলে লোকাল গাইড হিসেবে নিয়ে যাবার কথা, হঠাৎ বৃষ্টির জন্য বোধ করি এল না । ও না থাকলেও আমাদের কাছে জি পি এস, কম্পাস  আর টোপোগ্রাফিক ম্যাপ আছে, তবে একটু অসুবিধে  হবে । কডোমা থেকে গ্রানাইট হিল একুশ কিলোমিটার সাউথ-ইস্ট, পাঁচ কিলোমিটার পরে কাঁচা রাস্তা শুরু হবে, সেখান থেকে সাউথ- ইস্টের দিকে ঘুরতে হবে।আমাদের টোপোগ্রাফিক ম্যাপ তাই বলে, জি পি এস একটু বেশি  বলছে, কারো খেয়াল নেই যে মেঘলা আকাশে জি পি এস একটু খেয়াল খুসি করে। খানিকক্ষণ পরে সেই নিয়ে আরো বেশী হয়রানি হল, সে কথায় পরে আসছি। সুরু হোল গ্রানাইট পাহাড় যাবার, চুলের কাঁটার মত, পাহাড়ের চার পাশে প্যাঁচ  দেওয়া কাঁচা রাস্তা। ষোল কিলোমিটার এই রাস্তাটাতে  চড়াই উতরাই করে, একটা পাহাড় টপকে, তবে গ্রানাইট হিলে যাবার রাস্তা আসবে। জাপানি ট্রাক গজরাতে গজরাতে প্রথম পাহাড়চুড়োতে উঠে এলিয়ে পড়ল। একে বৃষ্টিতে ভেজা কাদা রাস্তা তার ওপর মাল পত্রে ভরতি টাব,  একটু বিশ্রাম পেলে ঠিক হয়ে যাবে, আমাদের ড্রাইভার বন্ধু রবার্ট এই বলে আমাদের আশ্বস্ত করলেও পরে আবার উতরাই পথে জাপানি বাবা কয়েক বার কাশতে কাশতে আবার বিগড়ালেন।  সদা হাস্যময়  রবার্ট এবার গম্ভীর মুখে ইঞ্জিনের বনেট খুলে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষায়  মন দিলে। কিছুক্ষণ পরে বড় ডাক্তারদের মতো বললে এক-আধ ঘণ্টা লাগবে কিন্তু যদি তাতে না হয় তবে কি হবে আমি জানি না। তোমরা এত ভারি জিনিশ ভরেছ আমি আগে জানলে অন্য ব্যবস্থা করতাম” আমরা ঠিক করলাম এক ঘণ্টায় আমরা যতটা পারি হেটে এগিয়ে যাই, কিছু না হোক গ্রানাইট পাহাড়ের তলায়  পৌছাতে পারব। মুস্কিল হল আমাদের সব মেসিন পত্র রইল ট্রাকে পড়ে, এসব ছাড়াই যতটা সম্ভব সেটুকু কাজ এগিয়ে থাক।    
   
পাহাড়ি উতরাই রাস্তায় আমরা নামছি তো নামছিই, প্রায় এক ঘণ্টা চলেছি, কিন্তু চোখ রয়েছে পড়ে থাকা টুকরো কোয়ার্টজ পাথর গুলোর দিকে। এগুলো সব এসেছে পাশের গ্রানাইট পাহাড় থেকে, কিন্তু সবাই এসেছে, কিছু গ্রানাইট পাথর টুকরো ও এসেছে, কিন্তু আসে নি সে, ধূসর-ধোঁয়াটে রঙের কোয়ার্টজ পাথর, যাতে কোথাও-কোথাও  আছে সেই বহুমুল্যবান হলুদ ধাতু- সোনা। চড়া রোদ নিয়ে মাথার ওপরে রবি, প্রায় পাহাড়তলীর কাছাকাছি এসে গেছি আমরা, একটা বড় ছায়া দেখে আর লোভ সামলানো গেল না। একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক আর ম্যাপটা আর এক বার দেখেনি সকলে বসে। ছটফটে জীবন সবের আগে বেশ অনেকটা দূরে  ওকে হাঁক দিয়ে ডাকলাম সবাই। জীবন আমাদের ডাক শুনে পিছন ফিরে তাকালো আর বেচারি তাতে অন্যমনস্ক হয়ে হোঁচট খেল জোর আর গড়িয়ে মাটিতে পড়লো । সেই দেখে আমরা সবাই দৌড়ে গেলাম। সবাই মিলে গাছের ছায়াতে বসে কফি আর স্যান্ডুইচ খাচ্ছি, আর জীবন এর সাথে মজা করছি, ওর মত শক্ত জোয়ান, কিসে এমন হোঁচট খেল, যাতে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে হল? ও নাকি খুব শক্ত কিছুতে আঘাত করেছে, কিন্তু সেই জায়গাতে এত লতা পাতার জঙ্গল যে ও দেখতে পায় নি। সবাই তখনো বসে, আমার হঠাৎ কি মনে হল,জীবন যেখানে পড়ে গেছিল, সে জায়গার আগাছা সাফ করা সুরু করতেই বেরিয়ে পড়ল নুন- মরিচ রঙের গ্রানাইট, গড়িয়ে পড়া নয়, মাটি ফুঁড়ে এসেছে। সবাই মিলে এই জায়গাটার আশে পাশে লতা জঙ্গল সরাতেই অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটি ফুঁড়ে আসা  গ্রানাইট পাথর বেরিয়ে পড়ল এবং এই   পাথরকে ছোটো ছোটো কোয়ারটজ পাথরের স্তর চিরে গেছে । এটা যে  পাশের গ্রানাইট পাহাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে তাতে আর কোনো সন্দেহ রইল না।  


অবশেষে একটু নীচের দিকে যেতেই পাওয়া গেল ধোয়াটে সাদা রঙের সেই কোয়ারটজ পাথর এবং তার সাথে পাতলা চুলের মত উজ্জল হলুদ সোনা, এবং ছোটো দানা দানা সোনার নাগেট ।  
 যদি  আরও নিচে গিয়েও  বেশ কয়েক জায়গাতে এইরকম পাথর আমরা পাই তাহলে একদম নিশ্চিত হওয়া যাবে যে এই পাথর গ্রানাইট পাহাড় থেকে নেমে এসেছে তাহলে তো আমরা এক বিশাল কিছু ভাণ্ডারের সামনে। দারুন চার্জড হয়ে আমরা নিচে নামতে শুরু করলাম। পাহাড়ের নিচটায় গভীর জঙ্গল। সেইখানে একটা ব্যাপার ঘটলো।


বিশ্রী একটা পচা গন্ধ নাকে আসায় আমরা যখন  রুমাল দিয়ে জোরে নাক চেপে ধরতে ব্যস্ত তখন সবার আগে থাকা জীবন একটা উঁচু গাছের মগডালে কিছু দেখতে পেল। সকলে  এবার দেখলাম মগডালে মরা হরিন ঝুলছে। জীবন বললো লেপার্ড মানে চিতা অনেক সময় শিকার নিয়ে যায় মগডালে, যাতে আরাম করে খেতে পারে, এটা তারই কাজ হতে পারে।  মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমেল স্রোত চলে গেল, আমরা সবাই নিরস্ত্র, একটা ছুরিও কার কাছে নেই। কিন্তু জীবন এমন ভাবে আমাদের দিকে দেখছে যেন ব্যাপারটা কিছুই নয়। 

কতগুলো  শুকনো মোটা গাছের ডাল কুড়িয়ে আনল আর আমাদের হাতে হাতে দিল। এ দিয়ে কি হবে?  ও যেন তৈরি হয়েই এসেছিল। ব্যাকপ্যাক থেকে ডিজেল ভেজানো কাপড় বার করল। লাঠির গায়ে জড়িয়ে খুব তাড়াতাড়ি মশাল বানাল। এবার বেরল মানুষের কিম্ভুতকিমাকার মুখোশ।
সবাই এই মুখোশ মাথার পেছন দিকে লাগিয়ে মশাল জ্বালিয়ে এগোলাম, দুপাশে লম্বা লম্বা গাছের ঘন জঙ্গলের বুক চিরে, সাপের মতো আঁকা বাঁকা বনের  একফালি শুঁড়ি রাস্তায়। জীবন চলছিল সবার আগে আমরা ওর থেকে পিছিয়ে পড়ছিলাম।
এক জায়গায় রাস্তা বড় বেশি এঁকে বেঁকে গেছে, এটা পেরিয়ে যেতেই আমরা লক্ষ্য করলাম জীবনকে তো আর দেখা যাচ্ছে না। সবাই মিলে গলা ফাটিয়ে ডেকেও সারা পেলাম না। কি হল ওর? ওর তো উচিত ছিল একবার পিছন ফিরে দেখা। আরও কয়েকবার চেঁচিয়ে ডেকেও যখন সাড়া পেলাম না তখন মনে কু গেয়ে ওঠছিলো। জীবনের সেই আগে গেলে বাঘে... কিন্তু কিছুত একটা আমরা শুনবো। আমাদের মধ্যে একজন ফিস ফিস করে বলল চিতা বাঘ নাকি নিঃসাড়ে... আমরা সবাই তাকে ধমকে উঠলেও, ভয় কিন্তু এবার সবার হতে লাগলো। জীবনের জন্যে আবার নিজেদের জন্যেও।

জীবন সত্যি গেল কোথায়? কিছু পরে তার উত্তরও পেয়ে গেলাম। এমন কিছু পেলাম যা আমরা ভাবিনি কখন, প্রস্তুত ও ছিলাম না একজন কেউই আমাদের মধ্যে। সবার আগে আমি দেখতে পাই সেটা।
সামান্য দূরে একটা বাঁহাতি সরু রাস্তা এসে মিলেছে এই রাস্তার সাথে। ঠিক সেই মোড়ের মাথা থেকে একটু দূরে গাছগুলোর আড়ালে একটা মশাল মাটিতে পড়েও জ্বলছে, ওটা যে জীবনের তা যেমন বলার দরকার নেই আর দরকার নেই কেন ওটা ওখানে পড়ে।

এতক্ষণ আমরা প্রাণভয়ে ভীত ছিলাম, মুহূর্তের মধ্যে সেটা আদিম হিংস্র মানবের ক্রোধে পরিনত হল। সকলে নিজের নিজের জামা খুলে তৈরি হলাম মশাল গুলো আরো মোটা করতে, বাঘটার আভাস পেলেই সবাই একসাথে ছুড়ে মারব। সবাই মিলে আমরা  বৃত্তাকার হয়ে রইলাম,একে অন্যের মুখের দিকে চেয়ে, কোনোদিক থেকে শয়তান টা ঝাঁপাবে কে জানে? একটা ক্ষীণ আওয়াজ আসছে, আরে এটা তো জীবনের গলা। কিন্তু মনে হছে কাছেই কিন্তু  এত লোকের মশালেও তো দেখা যাচ্ছে না, আমরা সবাই মিলে এবার শুনলাম হেল্প, হেল্প, আমি এখানে


সবাই মিলে এগিয়ে গেলাম, একজন আমাকে পেছন থেকে জাপটে না ধরলে আমার অবস্থাও জীবনের মত হত, পড়তাম সোজা পিটের মধ্যে। অবশ্য একা হতাম না।       
অন্ধকারে ও যাতে ঘাবড়ে না যায়, সেজন্য একটা মশাল তৈরি করে তার গায়ে মাচিস বেঁধে নামিয়ে দেওয়া হল, ও চটপট জ্বালিয়ে নিল। কিভাবে ওকে উদ্ধার করা যায় সে নিয়ে আমরা বলাবলি করছি, দেখি হঠাৎ গায়েব, গেল কথায়? বলতে না বলতে কোথা থেকে মাটি ফুঁড়ে যেন উদয় হল জীবন।
অভিজ্ঞ লোক, আলো পেয়েই বুঝে নিয়েছে, এখানে কি কাণ্ড-কারখানা চলছিল আর বেরোবার ঢালু রাস্তাটা অর্থাৎ সাব- ইনক্লাইন ও এডীটটা কোথায়।


এখানে চলছিল কোনও বে-আইনি খনি এবং সেটা সোনার। পদ্ধতি গত নিয়ম গুলি না মেনে খেয়াল খুসি মতো মাইনিং করলে সোনার ডিম দেওয়া হাঁসের পেটে চাকু মারার মত হয়। একটু পরে তাতে আর মাইনিং করা যায় না। এখানে ও  ঠিক সেই কারনে  বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে  বে-আইনি সোনার খনি। আসার সময় দু হাতে যে পাথর গুলো এনেছিল তাতে বেশ কিছুটা নাগেট খালি চোখে দেখা যাচ্ছে। টন পিছু কম পক্ষে বিশ- পঁচিশ গ্রাম সোনা থাকতে পারে।

জীবন যে পিটে পড়ে গেছিল এবার আমরা তাতে সাব-ইনক্লাইন দিয়ে নেমে আরো কিছু পাথর নিয়ে এলাম। সেগুলো স্যাময় চামড়াতে রেখে, হাতুড়ির হাল্কা ঘা দেওয়া হল কিছুক্ষণ ধরে। চামড়ার টুকরোটা হেলিয়ে  ধরতেই পাথর গড়িয়ে পড়ল, সোনার দানা চামড়ার টুকরোতে আটকে রইল। আমাদের অনুমানের চাইতে বেশি সোনা আছে দেখা গেল।





* এই সত্যাশ্রয়ী গল্পটি কিছু সত্য ঘটনার আংশিক সংমিশ্রণে রচিত কাহিনি মাত্র, বাস্তব কোনও স্থান, কাল, ব্যাক্তির সাথে সাদৃশ্য কাকতালীয় মাত্র। সমস্ত  আলোকচিত্রগুলি লেখক দ্বারা গৃহীত।



0 comments: