ছবি ও লেখা: কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়
বাঘ মোটেই হালুম করে ডাকে না। ডাকার ইচ্ছে হলে খুব গম্ভীর একটা ‘ঘঁঅঅঅঅ’ আওয়াজ করে। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম হলুদ-কালো রঙের কম্বিনেশনটা মানুষের চোখকে খুব টানে তাই সব রেলস্টেশনের নাম ওই দুটো রং দিয়ে লেখা হয়। বাঘের গা দেখলে কথাটা বিশ্বাস হয়। ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে যখন সেই উজ্জ্বল ডুরি ঝলসে ঝলসে ওঠে, সে এক অনির্বচনীয় উত্তেজনা। আর জটায়ু ঠিকই বলেছিলেন, বাঘের পায়ে নির্ঘাত প্যাডিং থাকে। না হলে এত কাছ দিয়ে গেল অথচ একটুও শব্দ পেলাম না?
অবশ্য এত কথা আমি জানতে পারতাম না, যদি না আমরা গুড ফ্রাইডের লম্বা ছুটিটায় রণথম্ভোর ব্যাঘ্র সংরক্ষণ উদ্যানে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করতাম। বেড়াতে যাওয়ার এক্ষুনি দরকার হয়তো ছিল না, কিন্তু মগজের ভেতরটা একেবারে হাঁসফাঁস হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া আমাদের শুভবিবাহের প্রথম বার্ষিকী ঘনিয়ে আসছে, সেটা উদযাপনের ছুতো করে কোথাও পালাতে না পারলে নিজেদের ক্ষমা করতে পারছিলাম না। পাহাড় হয়ে গেছে, আশেপাশে সমুদ্রের চিহ্নমাত্র নেই, কাজেই হাতে থাকে জঙ্গল। আর জঙ্গল মানে জিম করবেট। লোনলি প্ল্যানেটে জিম করবেটের চ্যাপ্টার খুলে রাত জেগে মুখস্থ করছি, এমন সময় অর্চিষ্মান খবর আনল ওর বস সবান্ধবে জিম করবেট চলেছেন ওই উইকএন্ডেই। আমরা আর তিলমাত্র দ্বিধা না করে রণথম্ভোর বেছে ফেললাম। রণথম্ভোরের বাঘদর্শনই আমাদের কপালে ছিল, করবেটের চোদ্দপুরুষের সাধ্য কী তা খণ্ডায়। বাঘ বাঘ পে লিখখা হ্যায় দেখনেওয়ালে কা নাম।
দেখেছেন, খালি খালি বাঘের কথায় গিয়ে পড়ছি। কিন্তু বাঘে গিয়ে পড়ার আগে আরও কিছু কথা আছে, বাঘের তুলনায় সে সব কথা যতই আনইন্টারেস্টিং হোক না কেন আপনাদের না শুনিয়ে ছাড়ব না। শুক্রবার মারাত্মক রকম ভোরে আমাদের ট্রেন ছাড়ল হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে, গন্তব্য সওয়াই মাধোপুর। সওয়াই মাধোপুর নামটা আমার এত পছন্দ হয়েছে যে কী বলব। শুনলেই মনে হয় এইবার রাজকাহিনীর প্রথম পাতা খুলে বসছি। এইবার শুরু হবে ঢালতরোয়ালের ঝনঝনানি, বীর রাজপুতেদের সঙ্গে ততোধিক বীর ভীলকোলদের প্রাণপণ লড়াই।
সওয়াই মাধোপুর থেকে মোটে এগারো কিলোমিটার দূরে রণথম্ভোর ব্যাঘ্রবাগান, সেই বাগানের কাছেই আমাদের হোটেল, রাজস্থান ভ্রমণ পর্ষদের হোটেল সিদ্ধি বিনায়ক। হোটেলে পৌঁছেই ধপাস করে খাটের ওপর পড়ে যেই না টিভি খুলেছি দেখি মরণপণ যুদ্ধ লেগেছে। ধর্মেন্দ্র আর বাঘে। নিজের থেকে অন্তত একহাত লম্বা একটি বাঘকে জাপটে ধরে ধর্মেন্দ্র একবার এদিকে গড়াচ্ছেন, আরেকবার ওদিকে। এই বাঘ ওপরে তো এই ধর্মেন্দ্র, এই ধর্মেন্দ্র ওপরে তো এই বাঘ। রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধ শেষে বাঘকে মাটিতে পেড়ে ফেলে তার গায়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে বাঘের ভবলীলা সাঙ্গ করে ধর্মেন্দ্র হ্যা হ্যা করে হাঁপাতে লাগলেন। দেখা গেল এতক্ষণের মারামারিতে ধর্মেন্দ্রর জামাপ্যান্ট একটু ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে মাত্র, তাছাড়া আর বেশি লাগেটাগেনি। আমি অর্চিষ্মানকে বললাম, ‘শিখে নাও শিখে নাও, আজ এ জিনিস করতে হতে পারে।’ অর্চিষ্মান বলল, ‘বাঃ বেশ মজা তো, আমি বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করা শিখব, আর তুমি কী শিখবে?’ আমি বললাম, ‘কেন ওই যে হেমা মালিনী দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে শিউরে শিউরে উঠছেন আর বারবার মুখে ওড়না চাপা দিচ্ছেন, সেইটা?’
স্নানটান করে, চুলটুল আঁচড়ে, বেসন কি গাঠঠি অউর ভিন্ডি কি ভাজি দিয়ে ভাতটাত খেয়ে আমরা সিদ্ধি বিনায়কের রিসেপশনে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। সাফারিতে যাব। দু’রকম ভাবে সাফারিতে যাওয়া যায়। জিপ নয়তো ক্যান্টর চড়ে। ক্যান্টর হচ্ছে ছাদখোলা ছোট বাস। আপনি সাফারিতে জিপে চড়ে যাবেন না ক্যান্টরে চড়ে, সে সম্পর্কে থিওরেটিক্যালি আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দুটোই অনলাইন বুক করার সুযোগ আছে। জিপের দাম সামান্য বেশি, কারণ তাতে সহযাত্রীর সংখ্যা কম। কিন্তু থিওরির বাইরেও একটা বাস্তব জগৎ আছে, যেটা থিওরির ধার ধারে না, যেটায় ইকনমিক্সই শেষ কথা বলে। সেখানে জিপের দাম ও যোগান নির্ধারিত হয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। সে দাম নির্ধারণে সরকারের কোনও কারিকুরি নেই, সবটাই ইনভিজিবল হ্যান্ড। পরিণতি, অনলাইনে কখনওই জিপ বুক করা যায় না। অন্তত আমরা পারিনি। সাহস করে জিপ বুকিং অকুস্থলে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখা যেত, কিন্তু আমরা দুজনেই রামভীতু, আমরা অনলাইনে ক্যান্টর রিজার্ভ করে রেখেছিলাম।
সাহসের দরকার অবশ্য ওখানেই ফুরোবে না। সেটাই স্বাভাবিক। এ তো আর নন্দনকাননের রুগ্ন সাদা বাঘ দেখতে যাচ্ছেন না, এ হচ্ছে রীতিমত রাজপুত বাঘ। তাকে দেখতে হলে আপনার বুকে প্রায় বাঘের মতোই সাহস থাকতে হবে। সাফারি শুরু করার আগেই আপনার কানে নানারকম হাড়হিমকারী খবর এসে পৌছবে। ধরুন আপনি যাচ্ছেন জোন টু-তে (রণথম্ভোরের জঙ্গলে আছে ছ’টি প্রধান জোন, প্রতি ক্যান্টর বা জিপের আগে থেকে জোন নির্দিষ্ট করা থাকে, তাদের সবাইকে সেই সেই জোনেই যেতে হয়), এমন সময় খবর পেলেন জঙ্গলের পঞ্চাশটির ওপর বাঘ, সকলেই জোন টু ছেড়ে চলে গেছে। গিয়ে তাঁবু ফেলে বসে আছে জোন নম্বর পাঁচে, যেখান থেকে কাল বিকেলেই আপনাদের প্রতিবেশীরা ঘুরে এসেছেন। ওঁরা অবশ্য পঞ্চাশটি বাঘকে দেখেননি, দেখেছেন একটিকেই, কিন্তু জোন টু-তে গিয়ে আপনি যে বাঘের গায়ের গন্ধটুকুও পাবেন না, সে নিয়ে ওঁদের কোনও সন্দেহ নেই।
আপলোগোকো জোন ফাইভ বুক করনা চাহিয়ে থা। মেরা ব্রাদার-ইন-ল ইন্ডিয়ান টাইগারস পর থিসিস লিখ রহা হ্যায়, উসনেই সারে ইনসাইড ইনফরমেশন দে দিয়া হ্যায়। এনিওয়ে, ডোন্ট ওয়রি, জোন টু মে আপলোগোকো বহোত সারে মাংকিস দিখনে কো মিলেগা, দে আর প্রিটি কিউট টু।
ক্যান্টর যখন গেট পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকল তখন আমাদের মনে বাঘ দেখার বিন্দুমাত্র আশাও ছিল না। একদিক থেকে ভালোই হয়েছিল। যা-ই দেখছিলাম তাতেই খুশি হয়ে উঠছিলাম। হামীর কুণ্ড নামের ছোট্ট ডোবা, ডোবার গায়ে চেতাবনী বার্তা লেখা। নামলেই মগরমচ্ছে টেনে নিয়ে যাবে। কতরকমের যে হরিণ দেখলাম। কারও কারও শিং ছোটবেলার অমরচিত্রকথার বইতে দেখা ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির মতো জমকালো। সম্বর দেখলাম, নীলগাই দেখলাম, নীলগাইয়ের পিঠে বসা পুঁচকে বাঁদরছানাও বাদ গেল না। আমাদের ক্যান্টরে খানদুয়েক শিশু ছিল, তাদের বাবামারা যত তাদের ভালো ভালো জন্তুজানোয়ার দেখাতে চায়, ‘বেবি, ও দেখো ডিয়ার, ও দেখো পিকক’, তাদের সব উত্তেজনা মাংকিদের ঘিরে। ‘মাম্মি এক বেবি মাংকিকো ঘর লে চলতে হ্যায়, প্লিজ?’ কী ভয়ংকর প্রস্তাব। মাবাবা অলরেডি দু’পেয়ে মাংকি নিয়ে নাজেহাল, এর পর আরেকখানা চারপেয়ে জুটলে যে আর দেখতে হবে না।
রণথম্ভোরের জঙ্গল ভীষণ সুন্দর। সে বাঘ দেখা গেলেও, না গেলেও। ঊষর মাটি, দূরে উঁচু হয়ে ওঠা পাহাড়, পাহাড়ের গা জুড়ে শুকনো গাছের পাতলা পাতলা ডাল। দূর থেকে পাঁশুটে তুলোর মতো দেখতে লাগে। রাস্তা বিতিকিচ্ছিরি রকমের উঁচুনিচু। ঝাঁকুনিতে দেহের কলকবজা সব খুলে আসার জোগাড়।
ঝাঁকুনিতে আমার বেশি কষ্ট হচ্ছিল না। রাত দশটার পর ফাঁকা জি. টি. রোড ধরে ছোটা তিন নম্বর বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা আছে যাদের তাদের ঝাঁকুনি দিয়ে কুপোকাৎ করা শক্ত। সমস্যাটা হচ্ছিল ঝাঁকুনির সঙ্গে সঙ্গে চোখকান খোলা রাখার মাল্টিটাস্কিং করতে। জঙ্গলে আমার মতো লোকদের ভারি অসুবিধে। এমনি সাধারণ সময়েই আমি অর্ধেক জিনিস দেখতে পাই না। ওই ওই ঝপ করে একটা তারা খসে গেল, ওই ওই পাতার ফাঁকে ফুড়ুৎ করে একটা দোয়েলপাখি উড়ে গেল, ওই ওই রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে একটা হাতি চলে গেল – সবেরই উত্তরে আমার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, ‘অ্যাঁ, কোথায় কোথায়? আমি দেখতে পেলাম না তো?’ ছোটবেলায় পাড়াপড়শিরা বলত ভাবুক, বাড়ির লোক বলত ট্যালারাম।
তাও যে আমি এতগুলো পশুপাখি দেখতে পেলাম তার একমাত্র কারণ আমাদের সহযাত্রীরা। আমি যতই ‘কাঁহা? কাঁহা?’ করি না কেন, তাঁদের ধৈর্য ফুরোয় না। ‘আরে উধার উধার।’ কী চোখ! অন্তত সিকি মাইল দূরের একটা গাছের মগডালে দু’খানা প্যাঁচা বসে আছে, ঠিক দেখে ফেলেছে। আমিও দেখলাম। সেমিনারে বসে থাকাকালীন আমার মুখটা কেমন দেখতে লাগে তার একটা আন্দাজ পাওয়া গেল।
ক্যান্টর ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চলল। দেখলাম ক্যান্টরের চাকার পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে অন্তত হাত ছয়েক লম্বা ‘ঢামন’ সাপ, ইতিউতি জমে থাকা জলে জেগে রয়েছে কাছিমের খোল, মাছরাঙা ঝাঁপ মারছে দিঘির জলে। লক্ষ লক্ষ ময়ূর। চিড়িয়াখানার বাইরে ময়ূর আমি বিস্তর দেখেছি, জে এন ইউ ক্যাম্পাসে মানুষ আর কুকুরের পরেই সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে ময়ূর। কিন্তু সে ময়ূরের সঙ্গে এ ময়ূরের কোনও তুলনাই চলে না। কী পেখম, কী রং, কী দেমাক। ময়ূরকণ্ঠী রঙের মাহাত্ম্য এই প্রথম ঠিক ঠিক বোঝা গেল। ক্যান্টরের ইঞ্জিনের গোঁগোঁ ছাপিয়ে উঠছিল জঙ্গলের আওয়াজ। দিনের বেলা অত জোর ঝিঝিঁর ডাক আর শুনিনি।
এমন সময় হঠাৎ দেখি দূরে দু’খানা জিপ দাঁড়িয়ে আছে। আর একখানা ক্যান্টর। আর তাদের যাত্রীরা সব এমন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে রাস্তার বাঁদিকে খাদের দিকে যেন মনে হচ্ছে নিচে শাহরুখ খানের শুটিং চলছে।
কিন্তু আমরা জানি ওখানে শাহরুখ খান নেই। কী আছে সেটা আন্দাজ করতে পারি। সত্যিই কি আছে? জোন টু-তেই? গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ক্যান্টর জুড়ে একটা অবিশ্বাস আর উত্তেজনার চাপা চিৎকার উঠেছিল, ড্রাইভার হাত তোলা মাত্র থেমে গেল। শ্শ্শ্শ্, ও লোগ শোরশরাবা পসন্দ নহি করতে হ্যায়। ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়েছেন ড্রাইভারজী। ঢালু পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে গেল ক্যান্টর। অন্যান্য গাড়ির দঙ্গলে গিয়ে দাঁড়াল। শত নিষেধ সত্ত্বেও আবার একটা রুদ্ধ উল্লাসে ফেটে পড়ল ক্যান্টর। খচাৎ খচাৎ শাটার উঠল আর পড়ল। সবাই সবাইকে আনন্দে প্রায় জড়িয়ে ধরে আরকি।
আমি ততক্ষণে বুঝে গেছি, আমার দ্বারা আর বাঘ দেখা হল না। কারণ আমি একগাদা গাছ আর পাথর ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি। মনে মনে ভাবছি সত্যি কথাটা বলব, নাকি লাফিয়েঝাঁপিয়ে বলব, ‘দেখেছি দেখেছি, স্পষ্ট দেখেছি...’ এমন সময় আমার মুখ দেখে অর্চিষ্মান এগিয়ে এল। ক্যান্টরের রেলিঙের একেবারে ধারে এসে নিচে পাথরের ফাটলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘সোজা আমার আঙুল বরাবর তাকিয়ে থাকো। যতক্ষণ না দেখতে পাচ্ছ, চোখ সরাবে না।’
আমি তাকিয়ে রইলাম। গাছ আর পাথর। পাথর আর গাছ। গাছ আর পা . . . এক সেকেন্ড! পাথরের নিচে ওটা কী?! একটা হলদে আভা কি দেখা যাচ্ছে? ওটাই? অর্চিষ্মান ঘাড় নাড়ল। ইয়েস ম্যাডাম, ওটাই। মধ্যাহ্নভোজনের পর বাঘমামা আরামের নিদ্রা যাচ্ছেন। তাও কি আরাম করে চোখ বোজার জো আছে? মাছির জ্বালায়? ততক্ষণে আমার দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে এসেছে। স্পষ্ট দেখলাম মামা ফুটবলের মতো গোল মাথা নেড়ে নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছেন।
সুলতানকে দেখার পর আমার নজরটাই কেমন বদলে গেল। বাঁদরগুলোকে নিতান্তই বাঁদুরে মনে হতে লাগল, সম্বরগুলোর কেমন যেন গরু-গরু হাবভাব, ময়ূর ভালো, কিন্তু এতগুলো একসঙ্গে দেখলে তার আর মাহাত্ম্য থাকে না, তাই না গো?
সোজা কথায় বাঘ ছাড়া সবই তখন আমার চোখে নিরামিষ ঠেকছে।
আমরা চোখকান খোলা রেখে চললাম। কিন্তু বাঘ আর দেখা গেল না। বাঘের অভাব ঘোচাতে ড্রাইভারজী তাঁর গল্পের ঝুলি খুলে বসলেন। পোচারদের কল্যাণে রণথম্ভোরের বাঘ একসময় প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছিল । এখন প্রশাসন নড়েচড়ে বসায় পরিস্থিতি ঘুরেছে। বনকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, বাঘ বেড়েছে, বেড়েছে ফরেনার ভ্রমণার্থী। আমরা জানতে চাইলাম রণথম্ভোরের বাঘ কখনও মানুষকে আক্রমণ করেছে কি না। ড্রাইভারজী জানালেন, মোটে দু’বার। একবার বনে কিছু একটা কাজ চলছিল। মজুররা সব কাজ করতে এসে দেখে একটু দূরে ঝোপের মধ্যে বাঘ বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তারা কাজ করতে অস্বীকার করল। তখন কন্ট্রাকটর বললেন, ‘আরে তুম সব ইধার রুকো, ম্যায় উসকো ভাগাকে আতা হুঁ।’
ক্যান্টরশুদ্ধু লোকের চোয়াল মেঝেতে ঠেকে গেল। আমার মুখ থেকে তো সশব্দে বেরিয়েই গেল, ‘ছাগল নাকি?’
অর্চিষ্মান এমন বীতশ্রদ্ধ মুখে আমার দিকে তাকাল যেন আমি একটি আস্ত ইনসেনসিটিভ, মৃত মানুষকে কুকথা বলছি। তড়িঘড়ি বললাম, ‘আরে আমি ভদ্রলোককে ছাগল বলিনি। আমি বলতে চেয়েছি উনি কি বাঘটাকে ছাগল ভেবেছিলেন যে ‘ভাগাতে’ গিয়েছিলেন?’
দ্বিতীয় আক্রমণের ঘটনাটা ঘটেছিল সংরক্ষিত অঞ্চলের সীমানার বাইরে। বাঘেদের নিয়ে এই একটা সমস্যা। মানুষ কেমন লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছে ওদের জন্য, রাজত্ব করার জন্য সাড়ে তিনশো বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি জায়গা নিঃশর্ত লিখে দিয়েছে ওদের নামে, তবু ওরা দেখ-না-দেখ সে লক্ষ্মণরেখার বাইরে বেরিয়ে আসে। পরদিন সকালে অন্য একজন ড্রাইভার ভাইসাব একটি ছোট পুকুর দেখিয়ে বলেছিলেন, ওঁর বত্রিশ বছরের জীবনে ওই পুকুরের ধারেই নাকি উনি সবথেকে বেশিবার বাঘের দর্শন পেয়েছেন। উদাস মুখে বসে বসে ল্যাজ নাড়িয়ে মাছি মারছে। এদিকে সংরক্ষণ উদ্যানের সীমানা খাতায়কলমে শুরু হয়েছে সেই পুকুরের অন্তত হাফ মাইল দূর থেকে। উদ্যানের ভেতর পুকুরেরও অভাব নেই, সে সব পুকুরের জলও সমান ঠাণ্ডা, তাদের ধারেও সমান নধর সম্বরেরা চরে বেড়ায়। তবু বাঘমামার ওই বাইরের এঁদো পুকুরটিই পছন্দ। যাই হোক, এই দ্বিতীয় বাঘটি সীমানা থেকে বেরিয়ে কাছের একটি জনবসতিতে চলে গিয়েছিল। মানুষ খুন করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, সে গিয়েছিল গরুমোষ কিছু পাওয়া যায় কি না দেখতে। একজন গ্রামবাসী জানোয়ার পাহারা দিচ্ছিলেন, তাঁর প্রাণটি বেঘোরে গিয়েছিল।
আমাদের ক্যান্টর ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে জোন টু-র ‘বেস্ট’ স্পটে। আপাদমস্তক ধূসর একটা জঙ্গলে হঠাৎ লাল পলাশের এমন মেলা দেখে চোখ কেমন ধাঁধিয়ে যায়। শুনলাম গরমকালে এখানেই বাঘ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি। আশেপাশে প্রচুর জিপ, ক্যান্টর অপেক্ষা করছে। জিপ নেওয়ার এটি আরেকটি সুবিধে। আপনি যতক্ষণ খুশি বাঘের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারেন। কেউ তাড়া দেবে না। আমরা খানিকক্ষণ দাঁড়ালাম। দারুণ লাগছিল। পাহাড়ের ওপারে সূর্য তখন পাটে বসবে বসবে করছে। গরম আছে, কিন্তু হাওয়াও কম নেই। হাওয়া, ফুল, জল, জলে ঝাঁপাঝাঁপি করা সম্বরছানা দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল।
কিন্তু বাঘ এল না।
আলো কমে আসছিল। ড্রাইভারজীও তাড়া দিচ্ছিলেন। হয়তো সুলতান এখনও শুয়ে আছে সেই পাথরের খাঁজে। ওকেই না হয় আরেকবার দেখে ফিরে যাব। এইসব ভেবে সকলে মিলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।
অতদূর যেতে হল না। মাঝপথে পৌঁছতে না পৌঁছতেই ড্রাইভারজীর হাত হঠাৎ শূন্যে হাওয়ায়। কী ব্যাপার, এখানে তো কোনও জিপ/ক্যান্টর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না, তার মানে বাঘও নিশ্চয় নেই?
কল হ্যায়।
কল?
হাঁ। শুনাই নহি দে রহা?
ট্যাঁ ট্যাঁ করে একটা কী যেন চেঁচাচ্ছে। তারস্বরে।
টাইগার হ্যায় আসপাস।
বলে কী? ক্যান্টরশুদ্ধু লোক দাঁড়িয়ে উঠেছে। সূচীভেদ্য নীরবতা। এমন সময় গুজরাতি দিদিমা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন।
‘তেয়াঁ ছে!’
কী আশ্চর্য, এবার আর আমার দেখতে দেরি হল না। দিদিমার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখ চলে গেল ডানদিকের বনে। কী একটা নড়ছে। ধূসর ডালপালার ফাঁকে ফাঁকে ঝিকিয়ে উঠছে তার উজ্জ্বল হলুদকালো ডোরা। সুলতানের ঘুম ভেঙে গেছে। সুলতান চলেছে জলের সন্ধানে। সুলতানের ঘাড়ের দুটো হাড় পালা করে উঠছে আর নামছে। বেশি না, এই হাত চল্লিশ দূরে।
ক্যান্টরের ওপর যে কী শুরু হল সে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। গুজরাতি ভয় পেয়ে ওড়িয়াকে জাপটে ধরল, ওড়িয়া বাঙালির পা পাড়িয়ে দিল, বাঙালি গিয়ে পড়ল মারাঠির ঘাড়ে, মারাঠি আধেক ব্যথা আধেক উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘আ-আ-ই-ই-ই...’
ড্রাইভারজী এদিকে ক্যান্টর ব্যাক করাতে শুরু করেছেন। সুলতানকে যতক্ষণ নজরে রাখা যায়। ক্যান্টর মাঝগঙ্গায় নৌকোর মতো দুলছে। অর্চিষ্মান আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে, গলা ভয়ংকর সিরিয়াস। ‘কুন্তলা, এক্সাইটেড হয়ে বাইরে পড়ে যেও না।’ আমাদের পেছনে একটা ক্যান্টর, আর একটা জিপ এসে জুটেছে ততক্ষণে। তাদের ছাদেও সমান পাগলামি শুরু হয়েছে। রেলিঙের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে নানারঙের মানুষ। বন্দুকের মতো বাগিয়ে ধরেছে লম্বাবেঁটে ক্যামেরার লেন্স।
সুলতান দিক চেঞ্জ করল। সুলতান ওপর দিকে উঠতে শুরু করেছে। আমাদের দিকে সোজা হেঁটে আসছে সুলতান।
সত্যি বলব? ভয় লাগে। সাংঘাতিক ভয়। কারণ কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় যে আমি একটা পিঁপড়েকে যেমন টিপে মারতে পারি, ও আমার ঘাড়ে একটা থাবা মেরে আমাকে তেমনি সাবাড় করতে পারে। আপনি যদি ধর্মেন্দ্র না হন, তাহলে ও জিনিসের নাগাল থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা নেগেটিভ।
সুলতান নিজের গতি একটুও না কমিয়ে (বা বাড়িয়ে, কী ভাগ্যিস) রাস্তায় উঠে এল। আমাদের ক্যান্টরের পাশ দিয়ে নয়, আমাদের পরের ক্যান্টরটার পাশ দিয়ে। একটু থেমে, সতর্কভাবে মাথা ঘুরিয়ে একবার জরিপ করে নিল পরিস্থিতি, শত্রুর অবস্থান ও সামর্থ্য, তারপর ক্যান্টর আর জিপের মাঝখানের খালি জায়গাটা দিয়ে সুলতানের ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়ে ওদিকের বনে অদৃশ্য হয়ে গেল।
গেটের বাইরে বেরিয়ে এসে অপেক্ষারত চারপাঁচটা জিপ ও ক্যান্টরের জটলাকে উদ্দেশ্য করে আমাদের ড্রাইভারজী হাঁক পাড়লেন, ‘আরে গণপত, সাইটিং হুয়া কেয়া?’ বুদ্ধিমান লোক। খবর কীভাবে ছড়াতে হয় জানেন। বোকার মতো, ‘বাঘ দেখেছি, বাঘ দেখেছি’ বলে চেঁচান না। জানেন তাতে মর্যাদাক্ষুণ্ণ হয়। ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করতে হয়, ‘আপনিও কি লেখেনটেখেন নাকি?’
অন্যদিক থেকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ধেয়ে এল আমাদের দিকে। বাঘ দেখেননি তাঁরা। বাঘের বদলে আমাদের দেখছেন। ‘ডিড ইউ সি ইট?’
‘আরে দেখা না। হামারা ক্যান্টর কে একদম পা-আ-আ-স সে গয়া। যাতে যাতে মুণ্ডি ঘুমাকে হামারা তরফ দেখা ভি। দুম ভি হিলায়া।’ আমরা সমর্থনে জোরে জোরে মাথা নাড়লাম। উনি যদি বলতেন ‘হাই ফাইভ ভি দিয়া’ তাহলেও মাথা নাড়তাম। কারণ চল্লিশ হাত দূর থেকে বন্য বাঘ দেখার বন্ডিং তখন আমাদের বেঁধে ফেলেছে। আমাদের মধ্যে আর ভেদাভেদ নেই। রোগা-মোটা, ফর্সা-কালো, শিবাজী-নেতাজী, জুম লেন্স-কিট লেন্স – কিচ্ছু না। এখন শুধু ওরা আর আমরা। ওরা যাদের সাইটিং হয়নি, আমরা যাদের সাইটিং হয়েছে। ওরা যারা অভাগা, আমরা যারা ভাগ্যবান। ওরা যারা কিস্যু পায়নি, আর আমরা যাদের মাথায় দক্ষিণরায় স্বয়ং সস্নেহ থাবা রেখেছেন।
*****
এর পর আর কিছু বলার থাকে না, তবু বলতে হয়। কারণ পরের দিন ভোরে আমাদের আবার সাফারির টিকিট কাটা আছে। আমরা ভোর ভোর উঠে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে রেডি হয়ে বসে আছি, কিন্তু ক্যান্টর আসার আগেই বৃষ্টি এসে গেল। ওরে বাবা সে কী বৃষ্টি। আমি আশা ছেড়ে রিসেপশনের সোফায় ঘাড় হেলিয়ে ঘুমিয়েই পড়লাম। কিছুক্ষণ পর দেখি অর্চিষ্মান ঠেলছে, ‘ওঠো ওঠো ক্যান্টর এসে গেছে।’ ধড়মড়িয়ে উঠে দেখি ক্যান্টর এসেছে ঠিকই, ক্যান্টরের মাথায় বসে আছে হাতে গোনা পাঁচটা লোক। সেকী, কাল বিকেলে তো জায়গাই হচ্ছিল না প্রায়। দু’ সেকেন্ড পর ঘুম খানিকটা কাটতেই অবশ্য কারণটা পরিষ্কার হয়ে গেল। বৃষ্টি তো কমেইনি, বরং বেড়েছে। তোড়ে সাদা হয়ে গেছে চারপাশ। আমি হাঁ করে অর্চিষ্মানের দিকে তাকাতেই অর্চিষ্মান বলল, ‘ম্যানেজার বলছে ক্যান্সেল করে দুপুরেরটায় যাওয়া যাবে না। ক্যান্সেল মানে একেবারে ক্যান্সেল।’
আমরা ক্যান্টরে উঠে পড়লাম। ব্যাগ থেকে কে. সি. পাল বার করে মেলে ধরলাম ঢালের মতো করে। সাইটিং-এর প্রশ্ন নেই। নিয়মরক্ষা সাফারিতে ক্যান্টর ছুটে চলল ঝড়ের বেগে। জলের ছাঁট আর ঝোড়ো হাওয়ার যুগ্ম আক্রমণে কে. সি. পাল প্রায় উড়ে যায় যায়, রাস্তার দু’পাশের গাছের ডাল ঝপাং ঝপাং ছাতায় বাড়ি মারতে লাগল। অর্চিষ্মান ছাতার হ্যান্ডেল ধরে রইল শক্ত করে, আমি একদিকের কাপড়টা ধরে প্রায় ঝুলে পড়লাম, যাতে ছাতা উল্টে গিয়ে ভেঙে না যায়। সত্যি বলছি, আমি চিরকাল মহেন্দ্র দত্ত ক্যাম্পের, অর্চিষ্মানের কে. সি. পালের প্রতি আমার একরকম নাকউঁচু তাচ্ছিল্যের ভাবই ছিল, কিন্তু শনিবারের পর আমি কে. সি. পালের ফ্যান হয়ে গেছি। ভেতো বাঙালি হয়ে রাজপুত ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে কী ফাইটটাই না দিল। আমাদের সর্বাঙ্গ যদিও ভিজে গোবর হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু দুটো মাথা আর ক্যামেরার ব্যাগটাকে কে. সি. পাল রক্ষা করেছে, নিজের প্রাণসংশয় করেও।
জঙ্গলে ঢোকার পরই কিন্তু বৃষ্টিটা ধরে গেল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে আলোও ফুটল। আমরা তখন খালি বলছি, ‘দেখেছ, যদি না আসতাম, কী আফসোসটাই না হত।’ যারা আসেনি তাদের উদ্দেশ্যে একটু হাহাহিহিও হল। চিকেন হার্টেড কোথাকার। আর তারপর যেটা হল সেটা আপনারা বিশ্বাস করবেন না।
ব্যাঘ্রগর্জন। একবার, দু’বার, তিনবার। চারবার। পাঁচবার।
আমাদের ক্যান্টরটা সবে একটু দম নিচ্ছিল, গাইডজী মাথাটাথা ঝাড়ছিলেন, ড্রাইভারজী গায়ের জামাটামা নিংড়োচ্ছিলেন। তিনি ‘আরে ত্তেরি...’ বলে দিলেন ছুট। সদ্য বৃষ্টি থামা সকালের আলোয় দেখলাম দূরে রক্তজমানো হুঙ্কার লক্ষ্য করে রণথম্ভোরের উঁচুনিচু প্রান্তর জুড়ে সারি দিয়ে ক্যান্টর আর জিপ ছুটে চলেছে, শব্দভেদী বাণের মতো। সে দৃশ্য আমার অনেকদিন চোখে লেগে থাকবে।
সেই সকালে আমরা বাঘ দেখতে পাইনি, খালি হুঙ্কার শোনাই সার হয়েছিল। আমাদের গাইড বললেন, ওটা নাকি টি-নাইনটিন নামক বাঘিনীর হুঙ্কার। টি-নাইনটিনের মাসদুয়েক আগেই চারচারটে ছানা হয়েছে, আর তার সুবাদে আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্রমহলে রণথম্ভোরের রেপুটেশনও বেড়েছে ঝপাং করে অনেকটা। এক বিরাট তালাওয়ের পারে বাঘের আশায় বসে বসে আমরা ভাবতে লাগলাম, হুঙ্কারের অর্থ কী হতে পারে। হয়তো টি-নাইনটিন ছানাদের শাসন করছে। ছানারা হয়তো ঘ্যানঘ্যান করে বলছে, ‘চল না মা, দিঘির ওপারেই তো ঝাঁক বেঁধে হাঁদাগুলো দাঁড়িয়ে আছে, থাবড়া মেরে একটাকে ধরে নিয়ে আসি। বৃষ্টির দিনে খাওয়াটা জমবে ভালো।’ মা হয়তো তখন ছানার মাথায় আলতো থাবা বুলিয়ে বলছেন, ‘ছিঃ ও কথা বলতে নেই। ওরা ভালো, ওরা বিনেপয়সায় আমাদের ছবি তুলে দেয়। ওদের মারলে শেষে সেলফি তুলে কাটাতে হবে সারাজীবন। সেটা কি ভালো হবে?’ তারপর হয়তো বলছেন, দু’পেয়েগুলোর সামনে যাওয়ার আগে যেন ছানারা যেন চুলটুল ভালো করে আঁচড়ে নেয়, ছবি ভালো উঠবে।
*****
বাঘের গল্প এখানেই শেষ। এরপর যেটুকু বাকি থাকে সে গল্পটা রণথম্ভোর দুর্গের। যে দুর্গটা সেদিন বিকেলে আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। নাগবংশের উত্তরসূরিরা যে দুর্গের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দশম শতাব্দীতে। যে দুর্গের সঙ্গে পৃথ্বীরাজ চৌহান, রানা হাম্বীর, রানা উদয়সিংহের নাম জড়িয়ে ছিল। দুর্গের ভেতর এখনও একটি ত্রিনেত্র গণেশের মন্দির আছে। তিনি নাকি ভীষণ জাগ্রত। টাটা সুমো বোঝাই হয়ে স্থানীয় লোকেরা গণেশঠাকুরের পুজো দিতে আসেন।
রণথম্ভোর দুর্গের ভেতরের ছবি তুলতে পারিনি, কারণ ক্যামেরায় এস ডি কার্ড পুরে নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। ভালোই হয়েছে একদিক থেকে। কীসেরই বা ছবি তুলতাম। ওইরকম পুরোনো দুর্গ আপনারা অনেক দেখেছেন। ওইরকম ভাঙাচোরা দেওয়াল, ওইরকম প্রকাণ্ড কাঁটা বসানো সিংদরজা। সিংদরজায় হেলান দেওয়া শহুরে টুরিস্টের ছবি তুলে দিচ্ছে গরিব গাইড। পাথুরে পথের পাশে দাঁড়িয়ে ফোঁৎ ফোঁৎ করে নিশ্বাস ফেলছে আর পা ঠুকছে নোংরা খচ্চর। পাথরের গায়ে খড়ি দিয়ে কেউ লিখে রেখে গেছে, ‘বিকাশ লাভস রোশনি’।
দুর্গের পাঁচিলের ওপর একটা নিরালা জায়গা বেছে, হাত দিয়ে তার ধুলোটুলো ঝেড়ে আমরা বসে রইলাম। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম অনেক নিচে দিগন্তজোড়া জঙ্গল কেমন এলিয়ে পড়ে রয়েছে। ভাতঘুম দিচ্ছে বোধহয়। জঙ্গলের মাঝে মাঝে তালাওয়ের ঢেউয়ের মাথায় বেলা চারটের রোদ দোল খাচ্ছে। চারদিকে কোথাও কোনও শব্দ নেই। কিংবা হয়তো আছে, আমরা এত ওপর থেকে শুনতে পাচ্ছি না। হয়তো আবার ‘কল’ উঠেছে জঙ্গলে। ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ। হয়তো দ্বিপ্রাহরিক ঘুম ভেঙেছে এতক্ষণে কারও। হয়তো কেউ হেঁটে চলেছে জলের দিকে। তার নিঃশব্দ পদচারণের সঙ্গে সঙ্গে চোখঝলসানো হলুদকালো ডোরায় ছাওয়া, ঘাড়ের কাছের দুটো হাড় ঢেউ তুলছে। লেফট-রাইট, লেফট-রাইট। আর জঙ্গল তার নিজস্ব ভাষায় খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে ডাল থেকে ডালে, শিকড় থেকে শিকড়ে, তালাও থেকে তালাওয়ে। রাজা আসছেন, যে যেখানে আছ, তফাৎ যাও।
জঙ্গল থেকে অত ওপরে, বিপদের নাগাল থেকে অত দূরে বসেও আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।

Valo laglo lekha ta pore. :)
ReplyDelete