ছবি ও লেখা: স্বদেশ মিশ্র
হঠাৎ যেভাবে দৃশ্য খুলে যায়।কাঠের মেঝের গায়ে ঝাঁপ দেয় রোদ্দুর।বেডের পাশেই দেখি পশম-পর্দা, যেটা সরালেই পাইন আর অনন্ত পাহাড়ের শ্রেণীর মধ্যে ব্যবধান বলতে মধ্যের এই কাঁচ।আর কাঁচ খুলে গেলে হাওয়ায় হাওয়ায়।এ রমক অবস্থায় লাফ দিতে ইচ্ছে করে।কিন্তু কাল হোলো কালকের শ্রম।ঘুমঘোর রেলগাড়ি-রেশ।এত দূর আর এত উঁচুতে,গতদিন খুব কুয়াশা থাকায় ঠিক বোঝা যায়নি।যাই হোক।মধ্যপন্থী এই ঘুম ঘুম ভাব এক অপার্থিব ভিলেন।পাহাড় যে একটা লম্বা নেশা সেটার সুযোগ পুরোপুরি পন্ড হবে।অতএব কফি দিয়ে শুরু হোলো।অর্ক সিম্ফনি জানে, কাঁচা আড়মোড়া ভেঙ্গে বলে উঠলো ‘কঞ্চার্তো’।ঠিকই, ডোরেমিফাসো... হয়ে আছে সারি সারি পাইন, আমাকে ডাকছে আরও ভেতরে, ওখানে জঙ্গলের ভেতর গেলে নাকি গাছে গাছে মিশে যাওয়া যায়।এটাই হোক তবে এই নাছোড় ঘুম কে পাশ কাটানোর অন্যতম মোটিভেশন।
ঘুম কে পাশ কাটিয়ে নয়।বরং শিলিগুড়ি টু সুখিয়া ভায়া ঘুম।কার্শিয়াং ছাড়াতেই সৌরভ মাথায় পড়ে ফেলেছে অমোঘ এক হনুমান টুপি এবং এটাই নাকি ওর প্রতিবাদ এই টুপি টার বিরুদ্ধে।সুখিয়া তে যেখানে গাড়ি নামালো সেখানেই পাওয়া যাচ্ছিলো আজব এক রঙ্গিন তেলেভাজা, দেখে বিশেষ ভরসা না হলেও তাৎক্ষণিক বিকল্প না মেলায় সৌরভ কিনলো, এমনিতে পাহাড়ে ঘুরতে থাকলেই মাঝে সাঝে এটা ওটা পেটে চলে যায়।একটু এগিয়ে ট্যাক্সির ছাদে ব্যাগ চালান হতেই গাড়ি স্টার্ট দিলো রিম্বিক-এর উদ্দেশ্যে, আমাদের স্টপ ধোত্রে।ওখানেই আগামী যাপন।
জনবিরল এক প্রাকৃত জঙ্গল এখনো ওখানে জীবন্ত, পরতে পরতে তার মায়ার বিস্তার।হঠাৎ বেরিয়ে পরতে আমাদের যেমন ট্রেনে বার্থবুকিং করার দরকার হয়না, তেমনই দরকার হয়না গাড়ি বুক করার। শেয়ারে শেয়ারে ঠিক একটা ব্যবস্থা করে পৌঁছে যাই যথাস্থানে।লাগে বলতে পিঠের স্যাক, পায়ের জুতো আর প্রয়োজনীয় টাকাকড়ি,ব্যস্, মুসাফির।এরপর বোম বোম!মানেভঞ্জং এ কয়েকজন নেমে যাওয়াতে গাড়ীর ভেতরটা হাল্কা হোলো ।অপূর্ব এক নেপালী গান বেজে উঠলো গাড়িতে, বাইরে সরে সরে যেতে থাকলো পাইন সমাহার, পাহাড়ের শ্রেনী।যেন চলছে চলুক, অমন নেপালী গান আগে কখনোশুনিনি।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পর্যাপ্ত অবসর।বিচ্ছিন্নতম এক পাহাড়ি জগৎ - ছোট ছোট ঘরবাড়ি আর তাকে ঘিরে গাছেদের সাম্রাজ্য।মার্চ এপ্রিলে এলে দেখা যেতে পারে উজ্জ্বল লাল হয়ে চতুর্দিক ছেয়ে থাকা রডোডেন্ড্রন।আর ডিসেম্বর-আলোকোজ্জ্বল দিনের নির্জন বৃক্ষলোক- ঘন নীল আকাশ - রাতের নীরব নক্ষত্র সমাবেশ – এত তারা-ছায়াপথ সমতল থেকে দেখা অসম্ভব।গভীরতর এক উপলব্ধির সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে আশ্চর্য এই পৃথিবী, যেন অন্য কোনো বিশ্বের দরজা পেরিয়ে প্রবেশ করেছি এখানে।এখানে মানুষ জানে ভালোবাসতে, সহজ মনের অকৃত্রিম আন্তরিকতা যা কোটি টাকা খরচ করলেও মেলেনা।
ওরা আমাদের বলে দিয়েছে জঙ্গলে একা না যেতে আর রাতে ঘরের বাইরে না বেরোতে –এটা সম্ভবত পৃথিবীর সমস্ত জঙ্গলের সাথে মিশে থাকা মানুষদের অলিখিত রীতি।হি হি ধরা ঠান্ডায় ব্র্যান্ডিই একমাত্র মেডিসিন।লোকাল পানীয় বলতে রক্সি ও গরম ছাং পাওয়া যাবে, তবে আমেজ নিতে গেলে একটু বুঝে শুনে।মাংস খেতে চাইলেবীফ, মাটন্ অথবা বন মোরগ, এখানে শুয়োর কেউ খায়না, শুয়োর খাওয়া এখানকার তামাং জন জাতির ধর্মবিরুদ্ধ।এছাড়া পাওয়া যাবে থুকপা( নুড্ল্ স্যুপ ), মোমো, ওয়াই-ওয়াই, ম্যাগী, অম্লেট্, কফি, চা, ডাল ভাত, আলুভাজা, কাবলি চানার তরকারী ও রুটি ইত্যাদি।এখানে মূল বাজারে কয়েকটা থাকার জায়গা আছে যেমন গৌতম-এর ট্রেকার্স হাট, আর বাজার থেকে একটু এগোলে শেরপালজ, যার জানলা দিয়ে অবিরাম কাঞ্চন্জঙ্ঘা।আবহাওয়া সাফ থাকলেই হলো,কাঞ্চন্জঙ্ঘা-র পুরো রেঞ্জ দৃশ্যমান হবে।দূর দূরান্তের পাহাড়শ্রেনী-র শেষে যেন অটল বুদ্ধ শুয়ে রয়েছেন আকাশের দিকে চোখ মেলে।অপার্থিব বর্ণচ্ছটা তাঁর সারা শরীর কে প্লাবিত করছে, কখনো বা মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে চারপাশ, নিসর্গের আবহে এখানে মেঘ যেন ঘনীভূত হয়, যখন তখন উড়ে এসে অনন্য মায়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলে পারিপার্শ্বিকতার সমস্ত কিছু, আবার মেঘ কেটে গেলে কাঞ্চন্জঙ্ঘা, অনন্ত পাইন আর পাখীদের সমাবেশ।ধোত্রে থেকে ট্রেক করে চলে যাওয়া যায় টোংলু টপ , টোংলু গেলে কাঞ্চন্জঙ্ঘা আর দু-চোখের মধ্যে কোনো ব্যবধান থাকেনা।ধোত্রের খেলার মাঠ পেরোলেই যে জঙ্গল সেই ঘন জঙ্গলের রাস্তা সোজা উঠে গেছে টোংলুর দিকে, ধোত্রের খেলার মাঠের চারপাশে পঁচিশে ডিসেম্বরের দিন থেকে শুরু হয় ফুটবল টুর্ণামেন্ট আর তাকে ঘিরে জমে ওঠে মেলা।বড়দিন থেকে পয়লা জানুয়ারী এখানে উৎসবের পরিবেশ।ফুটবল ম্যাচ যখন জমে ওঠে তখন আর কেউ তোয়াক্কা করেনা হাড়কাঁপানো ঠান্ডাকে, মাঠের চারপাশে শুকনো পাতা ডালপালা জ্বালিয়ে আগুনের সেঁক নিতে নিতে চলে ম্যাচ দেখা।খুব ঠান্ডালাগলে মাঠের পাশেই গরম কফি, গরম থুকপা অথবা গরম ছাংনামমাত্র খরচে , মানুষের আতিথেয়তায় এখানে কোনো কার্পণ্য নেই।প্রকৃতির-অরণ্যের সাথে মিশে যাওয়ার সুযোগ যেমন পর্যাপ্ত।ফিরে আসতে ইচ্ছে হবেনা।ফিরে এলেও বার বার ডাকবে ধোত্রে, নাম না জানা পাখী আর ফুলের নিশ্ছিদ্র জগত-এর সাথে আবার মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবার জন্য।
আমাদের কোনো উপায় ছিলোনা, নাগরিকতার দাসত্ব আমাদের পঙ্গু করেছে, ঘর-সংসার- কল্কাতার কোলাহল নৈরাজ্যে আবার ফেরার মধ্যে কেবল অস্বস্তি ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা। তবে এতটুকু বলা যায় , ইলেক্ট্রিক তারে মুখ ঢাকা দার্জিলিং টাউনের এর ধুসর বেখাপ্পা ঘিঞ্জি মেকিসাহেবিয়ানার মধ্যে গিয়ে পড়লে উদাস মনে যে অপার বিরক্তি ও ক্লস্ট্রোফোবিয়া তৈরী হয় তার থেকে অনেক অনেক ভালো ঐ নাম-গোত্র হীন ধোত্রের বিচ্ছিন্নতা, সেলফোন অচল হয়ে যাওয়া, অন্তত কয়েকটা দিনের জন্য।






0 comments: