শিরোনাম

দেবীর দশমহাবিদ্যা

দশমহাবিদ্যা রূপ
হিন্দুধর্মে দেবী অর্থাৎ দিব্য জননীর দশটি বিশেষ রূপের সমষ্টিগত নাম দশমহাবিদ্যা। মহাবিদ্যা কথাটি মূলত সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত মহা (অর্থাৎ মহৎ) ও বিদ্যা (অর্থাৎ প্রকাশ,রূপ,জ্ঞান বা বুদ্ধি) শব্দ দুটি থেকে মহাবিদ্যা কথাটির উৎপত্তি। এর সঙ্গে কখনও কখনও সংখ্যাবাচক দশ কথাটি যুক্ত হয়ে থাকে। দেবীত্বের এই রূপে একদিকে যেমন রয়েছেন ভয়ংকর দেবীমূর্তি,তেমনই অন্য প্রান্তে রয়েছেন এক অপরূপ সুন্দরী দেবী প্রতিমা।

মহাবিদ্যার সংখ্যা নিয়ে অনেক মতান্তর রয়েছে। এমনকি একটি মতে ২৭ টি মহাবিদ্যার উল্লেখ রয়েছে। দুর্গা, কামাখ্যা ও অন্নপূর্ণাও মহাবিদ্যার বিভিন্ন রূপ। তবে মুন্ডমালাতন্ত্র অনুসারে দশম মহাবিদ্যা হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভৈরবী, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলেকামিনী। আর মালিনী বিজয় গ্রন্থের মতে মহাবিদ্যা হলেন কালী,নীলা, মহাদুর্গা, ত্বরিতা, ছিন্নমস্তিকা, বাগ্বাদিনী, অন্নপূর্ণা, প্রত্যঙ্গিরা, কামাখ্যা বাসিনী, বালা, মাতঙ্গী ও শৈল বাসিনী।

শাক্ত ধর্মের ইতিহাসে মহাবিদ্যা ধারণার বিকাশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই ধারণা অনুযায়ী আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীতে শাক্ত ধর্মে ভক্তিবাদের সূচনা ঘটায়। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ হিন্দু দেব মণ্ডলীতে পুরুষদেবতার প্রাধান্যের প্রতিক্রিয়ারূপে এক নতুন ধর্মান্দোলনের সূচনা ঘটেছিল। এই নতুন ধর্মমতে পরম সত্ত্বাকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়। এই মতকে ভিত্তি করে একাধিক ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়। এই গ্রন্থগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল দেবীভাগবত পুরাণ। দেবী ভাগবত-এর সপ্তম স্কন্দের শেষ নয়টি অধ্যায় দেবী গীতা নামে পরিচিত। এটি শাক্ত ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ।

শাক্তরা বিশ্বাস করেন,একই সত্য দশটি ভিন্ন রূপে প্রকাশিত। দিব্য জননী দশটি বিশ্বরূপে পূজিত হয়ে থাকেন। এই দশটি রূপই হল দশমহাবিদ্যা। মহাবিদ্যাগণ প্রকৃতিগত ভাবে তান্ত্রিক। তাঁদের নাম গুলি হল:
কালী:  সর্বসংহারকারিনী,কাল ও মৃত্যুর দেবী। কালীকুল সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবী।
তারা : পথপ্রদর্শক ও রক্ষাকারিনী (তারিণী) দেবী। বিশ্বের উৎস হিরণ্যগর্ভের শক্তি এবং মহাশূন্যের প্রতীক।
ত্রিপুরসুন্দরী বা ললিতা-ত্রিপুরসুন্দরী (ষোড়শী):পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার স্বরূপ। শ্রীকুল সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবী। তান্ত্রিক পার্বতী নামে পরিচিতা।
ভুবনেশ্বরী:  বিশ্বজননী। পার্থিব জগতের শক্তিসমূহের প্রতীক।
ভৈরবী:  ভয়ংকরী দেবী। সেই কামনা ও প্রলোভনের স্বরূপ যা মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায়।
ছিন্নমস্তা: উলঙ্গিনী দেবীমূর্তি। তিনি স্বহস্তে নিজ মস্তক ছিন্ন করে নিজ রক্ত নিজেই পান করেন। চক্রপথে আত্ম ধ্বংস ও আত্ম পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে সৃষ্ট জগতের অবিরাম বিদ্যমানতার শক্তির প্রতীক।
ধূমাবতী: বিধবা দেবীমূর্তি। অগ্নির দ্বারা জগৎ ধ্বংসের পর ভষ্মরাশির মধ্য থেকে যে ধূম নির্গত হয়, তার স্বরূপ। তিনি কখনও কখনও অলক্ষ্মী বা জ্যেষ্ঠা দেবী নামেও অভিহিতা হন।
বগলামুখী : শত্রুনিষ্ক্রিয়কারিনী দেবী। ঈর্ষা,ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতার মতো মানবচরিত্রের অন্ধকার দিক নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁকে সারস-মুণ্ড রূপেও কল্পনা করা হয়।
মাতঙ্গী: কর্তৃত্ব শক্তির দেবী। জাতিহীন দেবী (কালীকুল সম্প্রদায়ে),তান্ত্রিক সরস্বতী।
কমলাকামিনী : বরাভয় প্রদায়িনী শুদ্ধ চৈতন্যের দেবী। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর অন্যরূপ। তান্ত্রিক লক্ষ্মী নামেও অভিহিতা।

দেবীর এই দশ রূপ,তা ভয়ংকরই হোক বা কোমল,বিশ্বজননী রূপে পূজিত হন।






0 comments: