
"এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে, আমার এ ঘরে থাকো আলো করে। এই প্রার্থনা বাংলার মাটিতে আদি অনন্ত কাল ধরে চলে আসছে। আর তাই বাংলার ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মীর আসন বিরাজমান। সমাজে আর্থিক প্রতিপত্তি কে না চায়। কে না চায় তার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। তাই নিজের সংসারকে শস্যশ্যামলা করে রাখতে সারা বাংলা জুরে মা লক্ষ্মীর বন্দনা হয়ে আসছে যুগ-যুগান্তর ধরে।
লক্ষ্মী হলেন হিন্দু দেবী। তিনি ধনসম্পদ, আধ্যাত্মিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী। তিনি বিষ্ণুর পত্নী। তাঁর অপর নাম মহালক্ষ্মী। জৈন স্মারকগুলিতেও লক্ষ্মীর ছবি দেখা যায়।
লক্ষ্মী ছয়টি বিশেষ গুণের দেবী। তিনি বিষ্ণুর শক্তিরও উৎস। বিষ্ণু রাম ও কৃষ্ণ রূপে অবতার গ্রহণ করলে, লক্ষ্মী সীতা ও রাধা রূপে তাঁদের সঙ্গিনী হন। কৃষ্ণের দুই স্ত্রী রুক্মিনী ও সত্যভামাও লক্ষ্মীর অবতার রূপে কল্পিত হন।
ব্রতকথাঃ লক্ষ্মীকে নিয়ে বাংলার জনসমাজে বিভিন্ন জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্পগুলি পাঁচালির আকারে লক্ষ্মীপূজার দিন পাঠ করা হয়। লক্ষ্মীর ব্রতকথাগুলির মধ্যে "বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা" সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া "বারোমাসের পাঁচালি"-তেও লক্ষ্মীকে নিয়ে অনেক লৌকিক গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাঙালি হিন্দুরা প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর সাপ্তাহিক পূজা করে থাকেন। এই পূজা সাধারণত বাড়ির সধবা স্ত্রীলোকেরাই করে থাকেন। "বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা"-য় এই বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মী ব্রত ও পূজা প্রচলন সম্পর্কে যে লৌকিক গল্পটি রয়েছে, তা এইরকম: এক দোলপূর্ণিমার রাতে নারদ বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মী ও নারায়ণের কাছে গিয়ে মর্ত্যের অধিবাসীদের নানা দুঃখকষ্টের কথা বললেন। লক্ষ্মী মানুষের নিজেদের কুকর্মের ফলকেই এই সব দুঃখের কারণ বলে চিহ্নিত করলেন। কিন্তু নারদের অনূর্ধ্বে মানুষের দুঃখকষ্ট ঘোচাতে তিনি মর্ত্যলোকে লক্ষ্মী ব্রত প্রচার করতে এলেন। অবন্তী নগরে ধনেশ্বর নামে এক ধনী বণিক বাস করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেদের মধ্যে বিষয়সম্পত্তি ও অন্যান্য ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া চলছিল। ধনেশ্বরের বিধবা পত্নী সেই ঝগড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে বনে আত্মহত্যা করতে এসেছিলেন। লক্ষ্মী তাঁকে ক্ষমা করে তার সব ধনসম্পত্তি ফিরিয়ে দিলেন। এইভাবে সমাজে লক্ষ্মী ব্রত প্রচলিত হল। এছাড়া শস্য সম্পদের দেবী বলে ভাদ্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি ও চৈত্র সংক্রান্তিতে এবং আশ্বিন পূর্ণিমা ও দীপাবলিতেও লক্ষ্মীর পুজো হয়।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজাঃ- ‘কো জাগরী'। অর্থাৎ কে জাগে। এই পূর্ণিমা তিথিতে মা লক্ষ্মী বরদান করবার উদ্দেশ্য মর্তে আসেন। আর পরিক্রমা করে দেখেন কে শুধু নারকেল জল পান করে সারারাত জেগে আছেন।
কথিত আছে এই রাতে যে ব্যাক্তি সারারাত জেগে পাশা খেলবেন মা তাঁকে ধন প্রদান করবেন। তাই এদিন লক্ষ্মীর পুজো করার পরে প্রথমে বালক, বৃদ্ধ ও আতুরদের খাওয়াতে হয়। পরে ব্রাহ্মণ ও বন্ধুবান্ধবদের নারকেল জল ও চিঁড়ে খাইয়ে তবে তা নিজে গ্রহণ করে সারারাত পাশা খেললে মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
তিথিঃ- কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর প্রকৃত সময় প্রদোষকাল। অর্থাৎ সূর্যাস্ত থেকে দু ঘণ্টা পর্যন্ত যে সময়। প্রদোষ থেকে নিশীথ অবধি তিথি থাকলেও সেই প্রদোষেই পূজা সম্পন্ন করাই বিধান। কিন্তু আগের দিন রাত্রি থেকে পরেরদিন প্রদোষ পর্যন্ত তিথি থাকলে পরেরদিন প্রদোষেই পুজো করা বিধেয়। আবার পূর্বদিন রাত্রে তিথি থাকলেও যদি পরদিন প্রদোষে তিথি না থাকে তাহলে পূর্বদিন প্রদোষেই পুজো করা কর্তব্য।
ধরণীকে ধনধান্যে শোভিত করে রাখার জন্য গোবর দিয়ে অলক্ষ্মী তৈরি করে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে ফেলে আসা হয়। আর লক্ষ্মীকে বাড়ির প্রধান দরজা দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। তারপর শুরু হয় লক্ষ্মীপুজো।
নমামি সর্বভূতানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে যা গতিস্ত্বৎপ্রপন্নানাং সা মে ভূয়াৎ ত্বদর্চনাৎ

0 comments: